কেন বাতিল হলো ১ লাখ ৯৫ হাজার বিও?

অর্থনৈতিক রিপোর্টার, আউটলুকবাংলা ডট কম

সময়মতো ফি পরিশোধ না করায় এক বছরের ব্যবধানে বাতিলের খাতায় যোগ হয়েছে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার বিও অ্যাকাউন্ট, যা আগের বছরের চেয়ে ২ হাজার বেশি। আগের বছর এই সময়ে বাতিল হয়েছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার বিও অ্যাকাউন্ট।

এই তালিকায় বিভিন্ন কোম্পানির ৫০টি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) ৯ হাজার ৪১২ অ্যাকাউন্ট রয়েছে। লেট ফি দিয়েও এসব অ্যাকাউন্ট আর চালু করা যাবে না। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের পাঠানো তালিকার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার সংরক্ষণকারী কোম্পানি সিডিবিএল (সেন্ট্রাল ডিপোজেটরি বাংলাদেশ লিমিটেড)।

জানা গেছে, সাধারণত ৩০শে জুন পর্যন্ত বিও অ্যাকাউন্ট নবায়ন করার সুযোগ থাকে। কিন্তু বিও হিসাবধারীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে বেশিরভাগ ব্রোকারেজ হাউজই জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সুযোগ রাখে। এর পরই সিডিবিএলে বাতিল বিওর হিসাব দেয়া লাগে। এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে বেশিরভাগ হাউজই বিনিয়োগকারীদের জন্য অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু এতে কোনো সাড়া মেলেনি, যে কারণে শেষ সময়ে এসে বন্ধ বিও হিসাব দিয়েছে অনেক হাউজ কর্তৃপক্ষ।

করোনা পরিস্থিতির জন্য এ বছর বিনিয়োগকারীদের হাউজে উপস্থিতি কম। এজন্য যেসব বিওতে শেয়ার অথবা নগদ টাকা নেই, সেসব হিসাব নবায়ন করার কথা ভাবেননি তারা, যে কারণে অনেক বিও বাতিল হয়েছে।

ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষ জানায়, এ বছর বাতিল বিওর সংখ্যা আরো বাড়তে পারত। সামনে মোবাইল অপারেটর রবির আইপিও অনুমোদনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ওয়ালটনের আইপিও রয়েছে, যে কারণে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অনেকে বিও নবায়ন করেছেন।

স্মরণকালের (২০১০ সালের) ভয়াবহ ধসের পর আর স্বরূপে ফিরতে পারেনি পুঁজিবাজার। মাঝেমধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আবারও পতনের ধাক্কা লেগেছে বাজারে। ফলে বাজারবিমুখ হয়ে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যার ধারাবাহিক ধাক্কা লেগেছে বিও অ্যাকাউন্টে।

এ নিয়ে গত ৬ বছরে নবায়ন না করায় বন্ধ হয়ে গেছে ৮ লাখের বেশি বিও অ্যাকাউন্ট। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার সংরক্ষণকারী কোম্পানি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

২৩ জুলাই সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ সালের অর্থবছর শেষে মোট বিও’র সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৪ হাজার ৬০২টি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৮টিতে। এদিকে গত ৩১ মে শেয়ারবাজারে মোট বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩৪২টি। বর্তমানে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৮টিতে নেমে এসেছে। এর মাধ্যমে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৮৪টি বিও বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান অ্যাকাউন্টধারীদের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারী ২৩ লাখ ৬৯ হাজার ৯৮৫, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৭ এবং বিভিন্ন কোম্পানির ১৩ হাজার ২৭৩টি।

তবে সিডিবিএল সূত্র বলছে, ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হলেও অলিখিতভাবে আরো কিছুদিন সময় রয়েছে। ফলে অ্যাকাউন্ট বাতিলের সংখ্যা আরো বাড়বে। গত বছর এ প্রক্রিয়ায় তারা ২ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট বাতিল করেছিল। একবার বন্ধ হলে ওই অ্যাকাউন্ট আর চালু হয় না।

জানা গেছে, অন্যসব বছরের মতো এবারও যেসব অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই প্রাইমারি মার্কেট বা আইপিওতে আবেদনধারী বিও। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটে সুবিধা করতে না পেরে পুঁজিবাজার ছেড়ে গেছেন কিছু বিনিয়োগকারী। আবার অনেক স্বল্পসংখ্যক শেয়ারধারীও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন।

ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, প্রতিবছরই নবায়ন না করার ফলে যেসব বিও বাতিল হয়, তার বেশিরভাগই প্রাইমারি মার্কেটের শেয়ারে আবেদন করার জন্য খোলা বিও অ্যাকাউন্ট। আমার মনে হয়, এ বছরও তা-ই হয়েছে। তবে প্রাইমারি মার্কেটের পাশাপাশি সেকেন্ডারি মার্কেট ভালো হলে আবারও বিও খোলার সংখ্যা বাড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছর প্রধানত দুই কারণে অসংখ্য বিও বাতিল হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বাজারের মন্দা পরিস্থিতি, অন্যটি প্রাইমারি মার্কেট থেকে বিনিয়োগকারীদের সুবিধা না পাওয়া।

নিয়মানুযায়ী, জুনে বিও ফি পরিশোধ না করলে সেসব অ্যাকাউন্ট এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যেসব হিসাবে শেয়ার কিংবা টাকা থাকে, সেসব হিসাব বন্ধ হয় না। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) ডিপোজিটরি (ব্যবহারিক) প্রবিধানমালা, ২০০৩-এর তফসিল-৪ অনুযায়ী, বিও হিসাব পরিচালনার জন্য ডিপোজিটরি অংশগ্রহণকারী বা বিনিযোগকারীকে নির্ধারিত হারে বার্ষিক হিসাবরক্ষণ ফি দিয়ে হিসাব নবায়ন করতে হয়। বিএসইসির জারি করা ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল এক সার্কুলারে ৩০ জুনের মধ্যে বিও হিসাব নবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। না হলে তা বাতিল করা হবে বলে ওই সার্কুলারে বলা হয়েছিল। বর্তমানে বিও নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। এর মধ্যে সিডিবিএল ১০০ টাকা, হিসাব পরিচালনাকারী ব্রোকারেজ হাউস ১০০ টাকা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কমিশন (বিএসইসি) ৫০ টাকা এবং বিএসইসির মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ২০০ টাকা জমা হয়।

সূত্র জানায়, আগে পুঁজিবাজারে আইপিও আবেদনের জন্য নামে-বেনামে প্রচুর বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। একই ব্যক্তি এক থেকে দেড়শ’ পর্যন্ত বিও অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে। আর এসব বিওতে শুধু আইপিও আবেদন করা হয়। ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ। কিন্তু ২০১০ সাল শেষে তা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়। আর এই প্রবণতা রোধে বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়াও বিও অ্যাকাউন্টে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সার্টিফিকেট দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অ্যাকাউন্টের স্বচ্ছতা আনতে গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ফরম পূরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্টদের চাপে শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার।