কিশোরগঞ্জের নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন

নয়নাভিরাম, বিনোদন আর প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানা

স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে ফিরে, আউটলুকবাংলা ডট কম

বর্ষা মৌসুমে কিশোরগঞ্জের হাওর বৈচিত্র্যপিয়াসী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন স্পটে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ পর্যটকদের কাছে হটস্পটে পরিণত হয়েছে হাওর এলাকা। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে হাওরের নবনির্মিত স্পটগুলো মুখরিত হয়ে উঠছে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে। বিশেষ করে করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা, চামড়াঘাট, নিকলী উপজেলার ছাতিরচর করসবন ও বেড়িবাঁধ, মিঠামইন উপজেলার দিল্লির আখড়া, আখড়া সংলগ্ন হিজল বন, হাসানপুর ব্রিজ, তাড়াইল উপজেলার হিজলজানি, ইটনা উপজেলার ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ব্যারিস্টার ভুপেশ গুপ্ত, বাংলার প্রথম র‌্যাংলার আনন্দমোহন বসুর বাড়ি এবং অষ্টগ্রাম উপজেলার সুলতানি আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক কুতুব মসজিদ ইত্যাদি স্পট ইতিহাস-অনুসন্ধানী প্রতিটি পর্যটককে মোহিত ও আলোড়িত করে।

মিঠামইন-ইটনা-অষ্টগ্রাম উপজেলার সংযোগকারী অবিশ্বাস্য অল-ওয়েদার সড়কটি হাওরের বারবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বদান্যতায় বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে এই তিন উপজেলাসহ গোটা হাওরের দৃশ্যপটে এসেছে আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই সড়ক পুরো হাওর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই শুধু পরিবর্তন আনেনি, গোটা হাওরের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকেও অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে। হাওরবাসীর জীবনমানে এসেছে পরিবর্তনের নতুন ছোঁয়া। ভর বর্ষা মৌসুমে উত্তাল হাওরের বুকচিরে প্রবহমান এই অল-ওয়েদার সড়কটি এক অদ্ভুত ও মায়াবি দৃশ্যের অবতারণা করে। পর্যটকরা এই অসাধারণ দৃশ্যের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দেশের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন নিকলীর বেড়িবাঁধ ও মিঠামইনের অল-ওয়েদার সড়কে। ইটনা থেকে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা পর্যন্ত হাওরের বুক চিরে নির্মিত ৩৫ কিলোমিটার অল-ওয়েদার সড়ক হয়ে উঠেছে পর্যটকদের দুর্নিবার আকর্ষণ।

প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় এখন মুখরিত হাওরের এক সময়ের অবহেলিত আর প্রত্যন্ত এই জনপদ। পর্যটকদের ব্যাপক আগমনের ফলে এই অঞ্চলের দরিদ্র বেকার তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। অনেক তরুণ মোটরবাইক, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন চালিয়ে যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রচুর অর্থ উপার্জন করছেন। এক শ্রেণির পেশাদার মাঝি নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোটের মাধ্যমে পর্যটকদের গভীর হাওরে পরিভ্রমণ করিয়ে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা সৃষ্টি হয়েছে এবং মূল্যও ক্রয়সীমার মধ্যে চলে এসেছে। হাওরের বালিখলা, চামড়াঘাট, মিঠামইন সদর, নিকলী বেড়িবাঁধ ও ইটনা-অষ্টগ্রাম সদরে দুই শতাধিক অস্থায়ী হোটেল, রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান স্থাপিত হওয়ায় কয়েকশ’ পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় হাওরের এসব অবকাঠামো দেশের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বেকার তরুণ-যুবকরা কর্মমুখী হয়ে ওঠায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আগের তুলনায় স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের কোথাও হাওরের মাঝখানে এত দীর্ঘতম দ্বিতীয় সড়ক আর নেই। প্রতিদিন হাজারো মানুষ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্বপ্নের সড়কটি দেখতে ছুটে আসছেন। সড়কের পাশে বসে বুকভরে নির্মল বাতাস নিচ্ছেন। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, বিনোদন আর প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানা হয়ে উঠেছে হাওরের এই অল-ওয়েদার সড়কসহ অন্যান্য অবকাঠামো। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির বাড়ির পশ্চিমে তিন শতাধিক একর জায়গা নিয়ে মিনি ক্যান্টনমেন্টের প্রস্তাবিত নির্মাণাধীন জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ করতেও অনেক ভিআইপি ও পর্যটক প্রতিদিন মিঠামইনে আসছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক মনস্তুস জানান, পর্যটকদের আগমন বেশি হওয়ায় প্রশাসনিকভাবে সড়ক রক্ষার স্বার্থে পর্যটকদের মোটরবাইক ও সড়কের পাশে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নোঙর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় চলাচল করার অনুমতি রয়েছে। তিন থানার পুলিশের নিরাপত্তায় রয়েছে অল-ওয়েদার সড়ক পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে ভিআইপিদের প্রটোকল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যায়ের ভিআইপিদের কেউ না কেউ প্রতি সপ্তাহে হাওরে আসছেন। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।

হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের অনেকেই বেশকিছু অভিযোগ করছেন। খাবারের হোটেলগুলোতে অত্যধিক হারে মূল্য গুনতে হয়। হোটেল মালিকরা ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করে পকেট কাটেন। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও করা হচ্ছে। তবে মিঠামইন সদর ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শরীফ কামাল পর্যটকদের ঘোরাফেরার জন্য অটোরিকশা ও সিএনজির ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অনেক পর্যটক জানিয়েছেন, রাস্তার পাশে হাওরের মধ্যে হোটেল-মোটেল তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এখানে রাত্রিযাপন করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক পর্যটক পরিবার-পরিজন নিয়ে এসে থাকার জায়গার অভাবে দিনব্যাপী ঘুরে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান। সড়কের দু’পাশে সাঁতার কাটার জন্য বিশাল জায়গা রয়েছে। এখানে হোটেল-মোটেল হলে মানুষ সমুদ্রসৈকতের পরিবর্তে হাওরের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে উঠবেন। প্রস্তাবিত মিঠামইন সেনানিবাসের পাশেই অত্যাধুনিক মেরিন একাডেমি নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘোড়াউত্রা পুরোনো নদীতে হচ্ছে ক্যান্টনমেন্ট লেক।

ছাতির চর

এখানে ঘুরতে আসা ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) সভাপতি ও চ্যানেল২৪-এর আউটপুট এডিটর হাসান ইমাম রুবেল বলেন, বাংলাদেশের হাওরে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, বিনোদন আর প্রশান্তির এ রকম জায়গা, না দেখলে বিশ্বাস হতো না। শুধু লোকমুখে শুনতাম হাওরের কথা। কিন্তু আজ নিজেই দেখলাম। আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। সময় পেলে আবার আসবো এই হাওর দেখতে। তিনি বলেন, ছাতির চর খুবই ভালো লেগেছে। ওখানে অনেক মজা করেছি। সেই ছোট বেলায় ফিরে গেছিলাম।

হাসান ইমাম রুবেল ছাড়াও সিএমজেএফর সাবেক সভাপতি ও অর্থসূচকের প্রধান সম্পাদক জিয়াউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন, সংগঠনের সহসভাপতি এম এম মাসুদ, অর্থ সম্পাদক আবু আলী, ইসি কমিটির সদস্য নিয়াজ মাহমুদ, মাহফুজুল ইসলাম ও গিয়াস উদ্দিন ঢাকা থেকে হাওর দেখতে আসেন।

মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রভাংশু সোম মহান জানান, অল-ওয়েদার সড়ক হাওরের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন হাওরের অবকাঠামো পরিদর্শনে কোনো না কোনো ভিআইপি আসছেন রাষ্ট্রপতির বাড়ি ও অল-ওয়েদার সড়ক দেখতে। মাঝে মাঝে পুলিশের প্রটোকল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সরকারি দুটি ডাকবাংলো ছাড়া রাত্রিযাপন করার মতো ভালো কোনো হোটেল নেই। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ইতিমধ্যে দুর্ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির ছেলে প্রকৌশলী রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই নিজ বাড়ি কামালপুরের রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান করে প্রতিদিনই নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন গ্রামে সামাজিক দূরত্ব মেনে এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির স্বপ্নের সড়ক রক্ষা করাসহ অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষার দায়িত্ব হাওর অঞ্চলের মানুষের। ইতিমধ্যে রাস্তার সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ সড়কটি হওয়ার ফলে তিন উপজেলার মানুষের যোগাযোগসহ পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের জন্য হোটেল-মোটেল নির্মাণ করতে আগ্রহী হয়েছেন এ এলাকার কিছু ব্যবসায়ী। মানুষ এখন আর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত যেতে চায় না। পর্যটনের জন্য এটাই উপযুক্ত স্থান বলে তিনি মনে করেন। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের জন্য আগামীতে আরো সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে জানিয়ে সংসদ সদস্য তৌফিক হাওর তথা দেশের এ সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

আরো