শীত আসতেই করোনার অবনতি

রাজধানীতে এখনো পুরোপুরি শীতের প্রকোপ না পড়লেও ঢাকার বাইরে এরই মধ্যে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। আর এই শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি। পরীক্ষা অনুপাতে বাড়ছে শনাক্তের হার। প্রতি সপ্তাহেই রেকর্ড ভেঙে তৈরি হচ্ছে নতুন রেকর্ড।

সোমবার নমুনা পরীক্ষা বিগত ৮১ দিনের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। রোগী বাড়ার সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মৃত্যু সংখ্যাও। হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসার জন্য বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসের টানা ৯ দিন থেকে সংক্রমণ আর ১১ দিন মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বগতির দিকেই রয়েছে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির এমন অবনতিকে কিছুটা উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, সংক্রমণ বাড়তির দিকে। তবে এর জন্য শীতের তাপমাত্রা যত না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী স্বাস্থ্যবিধি না মানা। বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৮ জন, নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৪১৯ জন আর সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ১৮৩ জন।

সবমিলিয়ে করোনায় মারা গেছেন ছয় হাজার ৪১৬ জন, সুস্থ হয়েছেন তিন লাখ ৬৪ হাজার ৬১১ জন আর করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন চার লাখ ৪৯ হাজার ৭৬০ জন। গতকালের এই শনাক্তের সংখ্যা গত ৮১ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর শনাক্ত হয়েছিলেন দুই হাজার ৫৮২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ২৪০টি নমুনা সংগ্রহ এবং ১৬ হাজার ৫৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ১৩১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। শনাক্ত বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ১০০ নমুনায় ১৫ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত বিবেচনায় প্রতি ১০০ জনে সুস্থ হয়েছে ৮১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং মারা গেছে ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

গত দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৪ নভেম্বর দিকে বাড়তে শুরু করে করোনায় সংক্রমণের হার। ওইদিন করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয় ১ হাজার ৫৩১ জনকে। ১৬ নভেম্বর এই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ওইদিন শনাক্ত করা হয় ২ হাজার ১৩৯ জন করোনা রোগী। এরপর ২১ নভেম্বর ছাড়া প্রতিদিনই সংক্রমণের হার ২ হাজারের উপরে ছিল।

১২ নভেম্বর থেকে বাড়তে শুরু করে করোনায় মৃত্যুর হার। ওইদিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল ১৩ জন রোগী। এরপর থেকেই গাণিতিক হারে বাড়তে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। ১৭ নভেম্বর সেই সংখ্যা ৩৯ জনে দিয়ে দাঁড়ায়। গতকাল পর্যন্ত ১১ দিনের মধ্যে ৪ দিন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২০ দিনের নিচে আর বাকি ৭দিনই মৃত্যুর সংখ্যা ২০ জনের উপরে ছিল।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘গত সপ্তাহের চেয়ে একটু বাড়তির দিকে। তবে এখনো বলা যাবে না যে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ সপ্তাহে যদি বাড়তে থাকে, তৃতীয় সপ্তাহে আরো বাড়ে এবং তখন যদি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তখন বলা যাবে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। যদি আগামী সপ্তাহে কমে যায়, তখন পরিস্থিতিকে আপডাউন বলতে হবে।’

শীতকে সামনে রেখে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কঠোর হতে বলছেন। পাশাপাশি এলাকাভেদে নতুন করে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের কথাও বলছেন। তবে বার বার বলার পরেও করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে যারা মাস্ক পরছেন না, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের ‘কঠিন সাজা দেয়া হবে’ বলে হুঁশিয়ার করেছে সরকার। গতকাল মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানানোর সময় সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ বিষয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘মাস্কের বিষয়টি (মন্ত্রিসভা বৈঠকে) খুব স্ট্রংলি এসেছে। গতকাল (রবিবার) কমিশনাররা জানিয়েছেন, তারা ম্যাসিভলি ফাইন করছেন। সারা দেশেই কয়েক হাজার লোককে ফাইন করা হয়েছে। আমরা বলেছি, আরো এক সপ্তাহ দেখতে। ফাইনেও যদি কাজ না হয় তাহলে মটিভেশন কর, তারপরে আরেকটু স্ট্রং পানিশমেন্টে যেতে হবে।

মাস্ক না পরলে কী ধরনের ‘কঠিন’ সাজা দেয়া হতে পারে, সেই প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘ফাইন বাড়িয়ে দিতে পারে। হয়ত এক হাজার টাকা, ৫০০ টাকা ফাইন করল সেটাকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিল। আমরা আরেকটু স্ট্রং ইয়ে (ব্যবস্থায়) যেতে বলেছি।”

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, এক ধরনের সতর্কতা জারি করতেই হবে। শীতে বাড়বে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে শীতে সতর্ক থাকতেই হবে। যারা শীতকালীন রোগে আক্রান্ত, তারা যদি করোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে করোনা জটিল আকার ধারণ করবে। এখন হয়তো শুরুর মতো (মার্চ) সবকিছু বন্ধ করা যাবে না, কারণ প্রান্তিক মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে।

কাজকর্ম বন্ধ করলে তখন আরেক ধরনের সংকট তৈরি হবে। কোথাও কোথাও বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে আরো বেশি কঠোর আরোপ করতে হবে। কোথাও কোথাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে হবে। কোথাও কোথাও নিজেদেরই মাস্ক সরবরাহ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের একার উদ্যোগ নিলে হবে না।

বর্তমানে সংক্রমণ বাড়ার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ কোল্ড বা ব্রঙ্কোলাইটিস, অ্যাজমা তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে। এক ধরনের মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে শীতকালে ভোগেই। তারা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। তবে বাড়ুক আর কমুক, সবচেয়ে বড় বিষয় সচেতন থাকতে হবে। সচেনতনতায় শৈথিল্য আসবে, লোকজন আক্রান্ত হবে। একজন মাস্ক পরে অন্যজনকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য। কিন্তু সেই অন্যজন যদি না পরে তাহলে প্রথমজন তো প্রটেকশন পাচ্ছে না।

আউটলুকবাংলা ডটকম /২৪ নভেম্বের ২০২০/এমএম 

আরো