একজন বাংলাদেশি তরুণীর এ গল্প

যেভাবে প্যারিস জয় করলেন মেহনাজ

অনলাইন ডেস্ক, আউটলুকবাংলা ডটকম

এ গল্প এক বাংলাদেশি তরুণীর। ডাক্তারি না পড়ে বরং স্নাতক হয়েছেন বায়োকেমিস্ট্রিতে। অথচ অন্তর্লীন অনুরাগ ছিল ফ্যাশনের প্রতি। সখের বশে শুরু করলেও সেটাই হয়ে গেছে তাঁর দায়িত্ব। তাঁর পেশা। তবে ফ্যাশন ডিজাইন নয়, বরং তাঁর ক্ষেত্র ফ্যাশন কমিউনিকেশন। শীর্ষ এক ব্র্যান্ডের দায়িত্ব নিয়ে ফ্যাশন ক্যাপিটাল প্যারিস মাতিয়ে চলেছেন ২৬ বছরের এই মেয়ে ।

এই প্রজন্মের সাড়াজাগানো ব্রিটিশ কণ্ঠশিল্পী ও গীতিকার ডুয়া লিপা। তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরে থাকেন একটি নামকরা ফরাসি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের পোশাক। কখনো রেডি-টু-ওয়্যার কালেকশন থেকে নিয়ে নেন, তো কখনো আবার তাঁর জন্য কাস্টমমেড করে দিতে হয়। গেল নভেম্বরে লন্ডনের একটি শোর জন্য তেমনই একটি পোশাক তাঁর প্রয়োজন। তাই আগে থেকে পাঠানো হয় বেশ কয়েকটি ডিজাইনের স্কেচ। ডুয়ার স্টাইলিং টিম বেশ কিছুদিন নীরব থাকার পর হঠাৎ করে সেই ডিজাইনগুলো থেকে একটি পছন্দ করে। এরপর শুরু হয় নকশা অনুযায়ী পোশাক তৈরির কাজ। তারপর প্যারিস থেকে সেই পোশাক লন্ডনে পাঠিয়ে ফিটিং দেখা হয়। জুমে পুরো বিষয়টি মনিটর করা হয় প্যারিস থেকে। এরপর প্রয়োজনীয় পরিমার্জন শেষে মূল পোশাক পাঠানো হয় লন্ডনে।

কিন্তু শোয়ের আগের দিন বাধে বিপত্তি। ডুয়ার স্টাইলিস্ট ফোনে জানান, পরার সময় এক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। তাই রাতারাতি সেটা ঠিক করে দিতে হবে। এখন তো সবার মাথায় হাত। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না। ইজ্জত কা সওয়াল। তাই প্যারিস থেকে একজনকে এক টুকরা কাপড়সহ প্লেন ভাড়া করে পাঠানো হয় লন্ডনে। সেখানে গিয়ে তিনি পোশাক মেরামত করে দেন। সারাভস্কি ক্রিস্টাল বসানো সেই পোশাক পরে মঞ্চ মাতান ডুয়া লিপা।

এভাবেই তারকাদের মন রাখা হয় ব্র্যান্ড ইমেজ অক্ষুণ্ন রাখতে। আর এই চাপ সামলান বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কমিউনিকেশন টিমের সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ডুয়া লিপা এবং তাঁর টিমের সদস্যদের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ রেখে পুরো বিষয়টি সুচারুভাবে যিনি সামলেছেন, তিনি একজন বাঙালি। আদ্যন্ত বাংলাদেশি। আইদা মেহনাজ।

মাত্র এক বছর হলো প্যারিসের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসমদ থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন অ্যান্ড লাক্সারি ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করেছেন। এরপর স্পেশালাইজেশন করেছেন ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনে। ২০১৯ সালে পাস করেই তিনি থিয়েরি মুগলার নামের এই বিখ্যাত ব্র্যান্ডে যোগ দেন। প্রাথমিকভাবে এটা ছিল তাঁর মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ। যদিও এই প্রতিষ্ঠান তাঁকে ছাড়েনি। বরং তিনি জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন। টানা এক বছরের দক্ষতায় মন জয় করে নেওয়ায় নতুন বছরে মেহনাজের পদোন্নতি হয়েছে। তিনি এখন সিনিয়র ব্র্যান্ড ইমেজ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কো-অর্ডিনেটর।

গেল সপ্তাহে এপিলিয়ন গ্রুপের অফিস নিনাকাব্যে বসে আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের ফ্যাশন ও তাঁর ব্র্যান্ডের নানা দিক নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় আইদার মেহনাজের সঙ্গে। সেদিন কথা প্রসঙ্গে শেয়ার করেন তাঁর এই অভিজ্ঞতা। জানা হয় ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের নানা দিক, তাঁর ব্যক্তিগত নানা অর্জন আর বাংলাদেশ ভাবনা।

বিখ্যাত ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার থিয়েরি মুগলার নিজের নামেই এই ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন সত্তর দশকে। পরে অবশ্য ব্র্যান্ডটি একাধিকবার হাতবদল হয়েছে। প্রথম এটা কেনে লাক্সারি স্কিনকেয়ার, পারফিউম ও কসমেটিক ট্রেডিং কোম্পানি ক্লারেন্স। এই প্রতিষ্ঠানের হাতে পড়ে ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হারায় মুগলার। ১৯৯২ সালে এই ব্র্যান্ড বাজারে আনে অ্যানজেল নামের সুগন্ধি। এটা সুপার-ডুপার হিট হয়। সেই ধারায় আরও জনপ্রিয়তা বাড়ায় এলিয়েন নামের আরেকটি সুগন্ধি। ফলে ক্রমেই ফ্যাশন থেকে সরে যায় মুগলার। রূপান্তরিত হয় পারফিউম ব্র্যান্ডে। দীর্ঘদিন এভাবেই চলতে চলতে গেল বছরের গোড়ায় মুগলারকে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্লারেন্স।

ফলে গত বছরের জানুয়ারি মাসে পুনরায় হাতবদল হয়ে মুগলার চলে আসে আরেক বিখ্যাত প্রসাধন ও সুগন্ধি কোম্পানি ল’রিয়েলের কাছে। ল’রিয়েলের কাছে আগে থেকেই আছে ইভস সাঁ লো, আরমানির মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের প্রসাধন আর সুগন্ধি। সেখানে যোগ হলো মুগলার। তবে সুগন্ধি আর প্রসাধন নিয়ে কাজ করলেও ফ্যাশনের সঙ্গে ল’রিয়েলের গাঁটছড়া পুরোনো এবং দৃঢ়। যা হোক, হাতবদলের পুরোটা সময় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেছেন মেহনাজ। অর্জন করেছেন দারুণ অভিজ্ঞতা। উভয় প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানালেন মেহনাজ। কারণ গত এক বছরে সেই অবস্থানের পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বললেন, ক্লারেন্সে ফ্যাশন ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; কিন্তু ল’রিয়েলে ফ্যাশন যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে করে ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে মুগলারকে নতুন করে তুলে ধরা সহজ হচ্ছে। বর্তমানে মুগলার শুধু পারফিউম নয়, ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে।

এমনকি এটা সমন্বিত ব্র্যান্ড হিসেবে কাজ শুরু করেছে। আর সেটা কেবল প্যারিসে নয়, বরং বিভিন্ন দেশে তাদের অফিসগুলোও অভিন্ন নির্দেশনা অনুসরণ করছে বলে জানালেন তিনি।

অতিমারির মধ্যেও সচলতা

প্যারিসে একটি সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন তিনি। এর একটা হোটেল সেকশনও আছে। সেখানে একটা রুম ভাড়া করে বিভিন্ন মৌসুমের সব পোশাক তিনি নিয়ে এসে রেখে দেন। এরপর বাড়ি বসেই সব কাজ করেন।

বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ, তারকাদের সঙ্গে যোগাযোগ, ফটোশুটের জন্য মডেল নির্বাচন থেকে ফটোশুট—সবই তিনি করেছেন এভাবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ অভিজ্ঞতাও শেয়ার করলেন তিনি। গেল সেপ্টেম্বরের প্যারিস ফ্যাশন উইকে সংগ্রহ উপস্থাপন সরাসরি না করে ফ্যাশন ফিল্ম করে ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে দেখানো হয়। এই কাজ ছিল যথেষ্ট জটিল। কারণ, অন্য মডেলদের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্যারিসে নিয়ে এসে শুট করা গেলেও প্যানডেমিকের কারণে সুপার মডেল ও শো স্টপার বেলা হাদিদকে নিউইয়র্ক থেকে উড়িয়ে আনা সম্ভব ছিল না।

তাই ব্রুকলিনে একটা স্টুডিও করে তাঁর পা থেকে মাথা স্ক্যান করে থ্রি-ডি ইমেজ করা হয়। এ জন্য ৫০০ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। আর লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস আর জার্মানিতে অ্যানিমেশনের কাজ হয়। কিন্তু সেটা মনঃপূত না হওয়ায় ২৮ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত শো বাতিল করে পরে প্রচার করা হয়। আর এই ফিল্মে বেলাকে সেন্টর হিসেবে দেখানো হয়। যেসব সেলিব্রিটি স্বাভাবিক সময়ে ফ্রন্ট রো আলো করেন, তাঁদের সবার বাসায় পোশাক পাঠানো হয়। তারা সেই পোশাক পরে ছবি তুলে পোস্ট দেন ফিল্ম প্রিমিয়ারের আগে। আর এভাবেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা হয়।

দেওয়া-নেওয়ার হিসাব

তারকাদের পোশাক দেওয়া হয়। এর হিসাব-নিকাশটাই বা কেমন? চটজলদি উত্তর মেহনাজের, ‘দুভাবেই হয়। আমাদের রেডি টু ওয়্যার কালেকশন থেকে অনেকে নিয়ে থাকেন। আবার টেইলর মেডও করে দেওয়া হয়। যেমন ডুয়া লিপার ক্ষেত্রে দুটোই হয়েছে। তবে আমরা তারকাদের পোশাক কিনতে দিই না; বরং দিয়ে দিই।’
কিন্তু বছর শেষে প্রাপ্তির হিসাবটা কীভাবে হয়?

-লেখালিখি হয়। আলোচনায় আসে। এর বাইরে আরও একটা হিসাব করা হয়। যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা লাইককে শূন্য দশমিক ৯৭ ইউরো হিসাবে ধরে হিসাব করা হয়। সেই হিসাবে মোট লাইকের বিপরীতে একটা মূল্যমান নির্ধারিত হয়। এভাবে বছর শেষে আমরা কমিউনিকেশন টিম থেকে একটা সার্বিক রিপোর্ট পাঠাই।

করোনাকালের সাফল্য

তাঁর নেতৃত্বে কমিউনিকেশন টিমের তৎপরতায় চলমান অতিমারির মধ্যেও ২০২০ সালে ২০টি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সাময়িকপত্রের প্রচ্ছদে এসেছে মুগলারের পোশাক। এই তালিকায় রয়েছে ‘ভোগ’, ‘হারপার বাজার’, ‘এল’সহ আরও পত্রিকা। এ ছাড়া ‘ভোগ’ তাদের বডিস্যুট নিয়ে আলাদা ফিচার করেছে। এর বাইরে গেল বছর এমটিভি ভিডিও অ্যাওয়ার্ডে টপ টেনে থাকা তিনজন ডুয়া লিপা, কার্ডি বি আর বিয়ন্সে পরেন তাদের পোশাক। মুগলারকে ফ্যাশনের প্রত্যাবর্তনকারী ব্র্যান্ড এবং আলটিমেট পপস্টার ব্র্যান্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ‘ভোগ’ সমায়িকী।

গেল বছর পপ তারকাদের বাইরে তিনি কাজ করে থাকেন বেলা হাদিদ আর ডেবরা শ’র মতো সুপার মডেল আর কণ্ঠশিল্পী আরিয়ানা গ্রান্ডের সঙ্গেও। এ ছাড়া অন্য মডেল ও সেলেবরা তো আছেই।

তাঁর কর্মদক্ষতায় খুশি হয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁকে ফুলের বুকে পাঠিয়েছেন বলে জানালেন তিনি।

যেমন করে হয় কমিউনিকেশন

এই প্রসঙ্গে মেহনাজ জানালেন, আসলে দুভাবেই হয়। বিভিন্ন সাময়িকপত্রকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাঁরা তিন ভাগে ভাগ করেন। ইউরোপ আর আমেরিকার পত্রিকাগুলো থাকে সবার ওপরে। ফলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কখনো অর্থ দিয়ে ফিচার, এডিটোরিয়াল করানো হয়। পেড আর্টিকেলের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি চাহিদা পূরণের বিষয় থাকে। আবার কখনো তারাও যোগাযোগ করে। সে ক্ষেত্রে তারা বিস্তারিত জানিয়ে দেয়। সেইমতো সবকিছু তাদের পাঠানো হয়। তবে কাদের নেওয়া হচ্ছে ফটোশুটে সেটা আমরা জেনে নিই। রেগুলার মডেল হলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারকাদের ক্ষেত্রে আমাদের পছন্দ থাকে। কারণ মুগলারের ব্র্যান্ড ডিগনিটির সঙ্গে যায় এমনদের সঙ্গেই আমরা কাজ করি। সবার সঙ্গে নয়।

মুগলারের জগৎটাই এজি—ভীষণ বোল্ড আর ডেয়ারিং। আমাদের পোশাকের শিলুয়েট অনেক শক্তিশালী। ফলে এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যারা যায়, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, জানালেন মেহনাজ।

এখানে আরও একটা বিষয় আছে, আমরা অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়েও কাজ করি। তবে আমাকে সব সময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। কারণ আমরা চাই না আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করেন তাঁরা কোনো বিতর্কে জড়ান, অবমাননাকর (বিশেষ করে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী প্রভৃতি নিয়ে) মন্তব্য করেন। আর সেটা হলে আমরা তাঁদের পত্রপাঠ বিদায় করে দিই।

এই ধরনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর হচ্ছে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। বর্তমানে তিনি ইউরোপের কমিউনিকেশনের দায়িত্ব পালন করছেন।

ফ্যাশন ব্র্যান্ডিং এবং বাংলাদেশ

প্রতিটি ব্র্যান্ডের আলাদা জগৎ থাকে। আমরা ব্র্যান্ড ইউনিভার্স বলি। যেখানে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় সম্পৃক্ত। এই বিষয়টা বাংলাদেশে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে একটা ব্র্যান্ডের পরিচয় তৈরি হয় না, বলছিলেন মেহনাজ, এখানে বাণিজ্য অগ্রাধিকার পায় ব্র্যান্ডিংয়ের তুলনায়। এ জন্যই বিভিন্ন ব্যান্ডের পোশাককে আলাদা করা যায় না। এই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে ব্র্যান্ডের পরিচয় তৈরি করতে হবে। কমিউনিকেশনের প্রতিটি পর্যায়েও সেটা থাকতে হবে।

পাশাপাশি আরও বললেন, আমাদের ফটোশুট যখন হয় তখন মডেল বাছাই থেকে মুডবোর্ড অনুসরণ, স্টাইলিং টিমের সঙ্গে যোগাযোগ, পোশাকের ট্রায়াল দিয়ে মডেল অনুযায়ী সেটা নির্ধারণ, মেকআপ প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিশ্চিত করা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় কপিরাইটার।

এই প্রসঙ্গে মেহনাজ আরও যোগ করলেন, প্রতিটি ব্র্যান্ডের জগৎই আলাদা। প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষারীতিও আছে। কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, আর হবে না সেই নির্দেশনাও সুস্পষ্টভাবে দেওয়া থাকে। যেমন আমরা কখনোই প্যান্ট শব্দটির ব্যবহার করি না; বরং ট্রাউজার বলি। আবার মুগলারে নিজস্ব কালার ব্র্যান্ডিং আছে যেমন কালো আর পাউডার ব্লু বা পেল ব্লু। যেটাই হোক না কেন, এই দুটো রঙের ছোঁয়া থাকবেই; এর সঙ্গে যোগ হয় সেই বছরের কালার প্যালেটের রং। এমন অনেক বিষয় আছে যার মধ্যে দিয়ে একটি ব্র্যান্ডের ডিএনএ প্রতীয়মান হয়।

তবে বাংলাদেশেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে আশাবাদী মেহনাজ চান এই ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করতে।

পরিবর্তনের পূর্বাভাষ

বিশ্ব এখন টেকসই পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। সম্পূর্ণ টেকসই পণ্য তৈরির আগে অনেকেই নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতিষ্ঠানেরও নিশ্চয়ই ভাবনা আছে?

-মেহনাজ জানালেন তাঁদের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, এ বছর থেকে তাঁরা সব ধরনের টেকসই পণ্য ব্যবহার করবেন। এ ছাড়া প্রতিবছর ৮-১০টি সংগ্রহ তারা তৈরি করে থাকে। সেটা কমিয়ে অর্ধেক করা হবে। তাতে করে পণ্যনকশা এবং তৈরিতে আরও মনোযোগ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া আরও একটা পদক্ষেপ তারা নিয়েছে; যথাসময়ে নিজেদের সংগ্রহ উপস্থাপন। অর্থাৎ ফ্যাশন উইকে ছয় মাস পরের সংগ্রহ উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তারা সেটা এখন থেকে না করে বরং অটাম-উইন্টার ফ্যাশন উইকে স্প্রিং-সামার কালেকশন দেখাবে আর স্প্রিং-সামার উইকে অটাম-উইন্টার কালেকশন।

এ ছাড়া ঋতুভিত্তিক ফ্যাশনের ধারণা থেকে সরে আসতে চাইছে অনেক ব্র্যান্ড। তাদের স্লোগান এখন: সি নাও, বাই নাও, ওয়্যার নাও। এখন দেখো, এখনই কেনো, এখনই পরো।

যদিও মেনাজ জানালেন, টমি হিলফিগার আর জিভোশেঁ এতে খুব একটা সাফল্য পায়নি। তবে মুগলার বেশ এক্সাইটেড। এই প্রসঙ্গে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আমি আমার সহকর্মীদের বললাম, এসব আমরা দেখেই বড় হয়েছি। আমাদের দেশে এভাবেই চলে। এটাই রীতি। ফলে এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়।
আরও জানালেন, প্রোডাক্ট টেকসই করার আগে গুচি তাদের প্যাকেজিংয়ে পরিবর্তন এনেছে। সবখানেই তারা সবুজ রং ব্যবহার করছে।

লাক্সারি ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ

সবকিছুই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে যাবে। আর মানুষের মধ্যে তো নিজেকে তুষ্ট করার, আত্মপ্রসাদ লাভের একটা বিষয় থাকেই; তাই এই ধরনের পণ্যের প্রতি আকর্ষণ কখনোই কমবে না। বরং সেটা থাকবেই। মানুষও কিনবে।

বায়োকেমিস্ট্রি থেকে ফ্যাশন কমিউনিকেশন

আইদা মেহনাজ মূলত বায়োকেমিস্ট্রির ছাত্রী। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষা তিনি নিয়েছেন ফ্যাশন কমিউনিকেশনে। ফ্যাশন ডিজাইন না পড়ে তিনি বরং ফ্যাশনের ভুবনে থাকতে চেয়েছেন এভাবেই।

তবে নর্থ সাউথে পড়ার সময়ই তিনি মডেস্ট ফ্যাশন নিয়ে অ্যাডভোকেসি করা শুরু করেন। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করেছে তার সঙ্গে। ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়া ফ্যাশন উইক চলাকালে তিনি আমন্ত্রিত হন বক্তা হিসেবে। সম্প্রতি মডেস্ট ফ্যাশন কাউন্সিল তাঁকে রিজিওনাল ডিরেক্টর মনোনীত করেছে।

ঢাকায় থাকার সময়েই তিনি ফ্যাশন কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করতেন। নিজের ব্লগে লিখতেন, ভিডিও করতেন। এরই মাঝে খণ্ডকালীন কাজ শুরু করেন ফ্যাশন ব্র্যান্ড সেইলরে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময় তাঁকে সহায়তা করেছে।

কারণ ফ্যাশন কমিউনিকেশন নিয়ে পড়ার জন্য তিনি নিউইয়র্ক ও প্যারিসে দুটো করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করেন। এর মধ্যে তিনি এসমদে সুযোগ পান। তবে এর আগে উত্তীর্ণ হওয়ার পথ ছিল ভীষণই কঠিন। একাধিকবার ইন্টারভিউ দিতে হয়। তবে তিনি উতরে যান। সেখানে পড়েন চার বছর। পড়ার সময় তিনি প্রথম প্যারিস ফ্যাশন উইকে দেখেন কেনজোর শো। সেটা ২০১৭ সাল।

পড়ার সময়ই তিনি ইন্টার্ন করেন শীর্ষ সারির প্রেস এজেন্সি কেসিডিতে। এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় তাঁর সুযোগ হয় বালমেঁ, ইসাবেলা মারান্ত, ভ্যালেন্তিনো, গুচি ও রিক ওয়েন্সের মতো একাধিক ফ্যাশন ও কসমেটিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার। ফলে প্রত্যেকের ব্র্যান্ড ইউনিভার্স আর তাদের বৈশিষ্ট্য, অনন্যতা, ব্র্যান্ড ডিগনিটি ও কালচার জানার সুযোগ হয়। যে অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে মুগলারে কাজ করতে এসে কাজে লাগছে, বললেন আত্মবিশ্বাসী মেহনাজ।

এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাক্ষাত্কার। যার মধ্যে ভোগ অ্যারাবিয়া একটি।

এখানে একটা ছোট্ট তথ্য শেয়ার করা প্রয়োজন। এপিলিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দিন আল মামুনের ভাগ্নী এই আইদা মেহনাজ।

বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা

বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্পের কারণে বেশ আদৃত। কিন্তু রানা প্লাজার ঘটনার জন্য বেশ নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। তবে সেই ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করেছি। আমার প্রয়াস থাকে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে তুলে ধরা।

তবে বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে তাদের ধারণা একেবারেই নেই। সেটা আমি দেওয়ার চেষ্টা করি। সফল ব্যান্ডগুলোর কথা বলি।

প্রথম প্রথম আমার পোশাকের কারণে অনেকের ধারণা ছিল আমি বোধ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে গেছি। কিন্তু বাংলাদেশ শুনে অবাক হয়েছে।

আর কেউ কি আছে বাংলাদেশের?

-প্যারিসে তো আর কাউকে আমি দেখিনি। আর লন্ডনে যারা আছে তারা আসলে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি।

এরপর

আসলে প্যানডেমিকের কারণে আমাদের ওয়ার্কলাইফ ব্যালান্স নষ্ট হয়েছে। এ বছর সেটাকে ফিরিয়ে আনতে চাই। নিজের ব্র্যান্ডের জন্য কাজ আছেই। তবে এর বাইরে অন্যান্য টপ ব্র্যান্ডে আমার যেসব বন্ধু আছে তাদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের জন্য কিছু একটা করতে চাই। এমনকি আমার ইউনিভার্সিটি এসমডের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারাও আগ্রহ দেখিয়েছে। দেখা যাক।

এখন তো মুগলারে আছি। ভবিষ্যতে অন্য টপ ব্র্যান্ডেও কাজ করতে চাই; যা আমার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তবে তার আগে আমি বিশেষ করে প্রত্যাশা করি বছরটা সুন্দরভাবে এগিয়ে চলুক। মানুষ ভালো থাকুক। এই করোনা থেকে মুক্তি পাক।

আরো