যে কারণে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটছে তুরস্কের

অনলাইন ডেস্ক, আউটলুবাংলা ডটকম

স্নায়ুযুদ্ধোত্তর কালে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্যে যে নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে চলতি শতকের শুরুতে। দুর্বল হয়ে পড়ে জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক সংগঠনগুলো। ইরাক যুদ্ধের সময়েই পর্যবেক্ষকদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়, শান্তিপূর্ণভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘ এখন আর আগের মতো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। অন্যদিকে সামাজিক-প্রাকৃতিক নানা সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থতার কারণে অর্থনৈতিক বিপত্তি শুরু হয় পশ্চিমা বিশ্বের। মারাত্মক আকার ধারণ করে আয়বৈষম্য।

ন্যাটোর মতো কৌশলগত জোটগুলো স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের তাত্পর্য হারিয়ে ফেলে। ফলে এ ধরনের প্রথাগত জোটগুলো একের পর এক ভাঙতে থাকে। স্বার্থের সংঘাত দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে। এর বিপরীতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মহাশক্তিধর হয়ে ওঠে চীন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন রাশিয়ার প্রভাবকে খর্ব করলেও সামরিক-পারমাণবিক শক্তি হিসেবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয় দেশটি। ইউরোপ মহাদেশে হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদ। ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যের দিকে হেলে পড়ে শক্তির ভারদণ্ড। এতে লাভবান হয় তুরস্কের মতো ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রভাবশালী দেশগুলো।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রভাবশালী হলেও এর আগ পর্যন্ত বৈশ্বিক পর্যায়ে ভূমিকা রাখার তেমন কোনো সুযোগ পাচ্ছিল না তুরস্ক। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেশটিকে সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের মনোযোগ সরে আসে এশিয়া প্যাসিফিকে। ফলে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও ককেশাসে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিধর দুই প্রতিযোগী হিসেবে দেখা দেয় রাশিয়া ও তুরস্ক।

সিরিয়া যুদ্ধসহ ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছরের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে পাল্লা দিয়ে চলেছে তুরস্ক। এসব সংকট মোকাবেলায় অধিকাংশ সময়েই মতৈক্যে পৌঁছতে পারেনি দেশ দুটি। তবে এ অনৈক্যের মধ্যেও আঙ্কারা ও মস্কো একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে গিয়েছে। কূটনীতিতে আগ্রাসী ও মহাশক্তিধর মস্কোর এ ধরনের আচরণকে আদতে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অথচ গত দশকে মারাত্মক জাতীয় ও আঞ্চলিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তুরস্ককে। বিশেষ করে ওবামা প্রশাসন সিরিয়ায় কুর্দি সশস্ত্র সংগঠন ওয়াইপিজের প্রতি খোলাখুলি সমর্থন ঘোষণার পর থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ সিরিয়া ইস্যুতে আঙ্কারা ও ওয়াশিংটনের পথ আলাদা করে দেয়। অন্যদিকে দেশেও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে), দায়েশ (আইএস) ও গুলেনপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠনের মোকাবেলা করতে হয়েছে তুরস্ককে। দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে চতুর্মুখী এ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আঙ্কারাই জয়ী হয়েছে। এ সময় তুরস্ক স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের পাশাপাশি নিজের রাষ্ট্রকাঠামোকেও শক্তিশালী করে তুলেছে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে তুরস্কের উত্থান আর ইউরোপ মহাদেশীয় শক্তিগুলোর অবক্ষয়—দুটিই একত্রে ঘটেছে। মার্কিন সমাজতাত্ত্বিক ইম্মানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের বিশ্লেষণ বলছে, নানামুখী সংকট ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলোকে আর্থিক, প্রশাসনিক, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে। ইইউর স্থবিরতায় বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত মহাদেশীয় জোটটি থেকে বেরিয়ে এসেছে। এর বিপরীতে একই সময়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে তুরস্কের প্রভাব আরো বেড়েছে। বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মোকাবেলার সক্ষমতা, সামরিক শক্তি, সমৃদ্ধ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার এবং কূটনৈতিক গভীরতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিজেকে দিন দিন আরো শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিজেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তুরস্ক এখন চাইছে ইসলামী বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন আঙ্কারার সামনে সুবর্ণ সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিয়াদের এ কূটনৈতিক পদক্ষেপ মুসলিমপ্রধান অনেক দেশের মধ্যেই ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এ বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের বৈরী প্রতিযোগী তুরস্ক চাইছে এখন ওআইসির পাল্টা আরেকটি জোট তৈরি করতে। এক্ষেত্রে ইরান, মালয়েশিয়াসহ আরো কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের সমর্থনও রয়েছে। এ পদক্ষেপ সফল হলে বিশ্বব্যাপী তুরস্কের প্রভাব আরো অনেকখানি বেড়ে যাবে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে সৌদি আরবসহ তুরস্কের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন দেশগুলোও। তুরস্কের উত্থান সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে রিয়াদের মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক আরো কয়েকটি দেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আঙ্কারার ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে দেশগুলো। এরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে গত সপ্তাহে এথেন্সে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে। ফিলিয়া ফোরাম নামে অভিহিত ওই সম্মেলনকে তুরস্কবিরোধীদের জোটবদ্ধতার প্রয়াস হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। আয়োজক গ্রিসসহ এথেন্সের ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে ফ্রান্স, মিসর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন ও সাইপ্রাস। দেশগুলোর এ সম্মেলনকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এরই মধ্যে এর নিন্দা করে একটি বিবৃতিও দিয়েছে তুরস্ক। তাতে বলা হয়, সম্মেলনে অংশ নেয়া দেশগুলো একে অন্যের প্রতি বন্ধুত্ব থেকে নয়, বরং আঙ্কারার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকেই এতে যোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে ভাষ্যকারদের মতে, দেশগুলোর এ জোটবদ্ধতা আদতে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বেরই স্বীকৃতি। এছাড়া এক দশকের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাকেও অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে দেশটি। চলমান করোনা মহামারীকে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলার মধ্য দিয়ে যেসব দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামনের সারিতে উঠে এসেছে তার অন্যতম হলো তুরস্ক। উন্নত দেশগুলোর জোট জি২০-এর সদস্য তুরস্ক মহামারীকালে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে জোটভুক্ত অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক ভালো করেছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান বলছে, ২০২০ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময় দেশটির শিল্পোৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ, যা জি২০ভুক্ত অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি।

আরো