রাস্তায় নামছে ‘বাঘ’, প্রতি কিলোমিটারে খরচ ৭৫ পয়সা

অনলাইন ডেস্ক, আউটলুবাংলা ডটকম

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির সঙ্গে সোলার প্যানেলও থাকবে

বৈধ সংযোগ ছাড়া চার্জ হবে না

১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের হাতছানি

সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় তৈরি পরিবেশবান্ধব অ্যাপভিত্তিক বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলার (তিন চাকার বাহন) ‘বাঘ’ খুব তাড়াতাড়ি সড়কে নামার অপেক্ষায় রয়েছে। তিন চাকার এই ইকোট্যাক্সিতে থাকছে অত্যাধুনিক সব ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা। দেশের সড়কে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসামাত্রই তিন চাকার বাহনটি বাজারে আনবে বাঘ ইকো মটরস লিমিটেড।

এরই মধ্যে ঢাকার গাজীপুরে কারখানা স্থাপন করে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু গাড়ি তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের পৃষ্টপোষকতা পেলে দেশের ভেতর স্বস্তিদায়ক যাত্রীসেবার পাশাপাশি এই ‘বাঘ’ রপ্তানি হতে পারে বিদেশেও। আসবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এমনটা জানালেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি।

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি জানান, বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ‘বাঘ’কে সরকার যদি রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনে, তা হলে বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করবেন তিনি। এতে একদিকে যাত্রীদের খরচ কমবে, অন্যদিকে সরকার বছরে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব পাবে।

তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান ‘বাঘ’ হবে পৃথিবীর প্রথম অ্যাপভিত্তিক কোম্পানি। কারণ, উবার, পাঠাও-এদের নিজস্ব গাড়ি থাকে না। এমনকি পৃথিবীর কোথাও অ্যাপভিত্তিক নিজস্ব পরিবহনও নেই। কিন্তু বাঘ সম্পূর্ণ দেশীয় পেটেন্টে তৈরি তিন চাকার ইকো-ট্যাক্সি।

অ্যাপভিত্তিক এই গাড়িতে থাকছে চালকসহ ৭ জনের বসার ব্যবস্থা। এ ছাড়া ওয়াইফাই, জিপিএস, টেলিভিশন, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, ইন্টারনেট সুবিধাও থাকছে এতে। বাহনটিতে ভাড়া মেটাতে ব্যবহার করা যাবে এটিএম কার্ডসহ যে কোনও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপস। প্রচলিত তিনচাকার বাহন থেকে বড় আকারের চাকার ব্যবহারে কমবে দুর্ঘটনা। উন্নতমানের স্টিল দিয়ে কাঠামো তৈরি হবে বলে বাহনটি হবে বাকিদের তুলনায় বেশি টেকসই।

কাজী জসিমুল ইসলাম উল্লেখ করেন, রাস্তায় যে সব ইজিবাইক চলছে, তাতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসিড ব্যটারি ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু বাঘ-এ থাকবে উন্নতমানের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। এর ব্যাটারি ও চার্জারে থাকবে মাইক্রোচিপ। যাতে একটি অ্যাপস প্রিলোডেড থাকবে (বিল্টইন)।

কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, প্রতিটি গাড়িতে বিকল্প হিসেবে থাকছে সোলার চার্জিং সিস্টেম। সোয়াপ (ব্যাটারির আলাদা চার্জ ব্যবস্থা) ব্যাটারি হওয়ার কারণে চার্জের জন্য বাহনটিকে থেমে থাকার প্রয়োজন হবে না। একবার চার্জে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলবে।

কাজী জসিমুল ইসলাম দাবি করেন, প্রচলিত ইজিবাইকে ব্যবহৃত অ্যাসিড ব্যাটারিতে মূলত আবাসিক ও অবৈধ বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ হয়। এর ফলে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ অপচয় হয়। ‘বাঘ’-এর চার্জার নিয়ন্ত্রিত হবে সিএমএস বা চার্জিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে এবং ব্যাটারি নিয়ন্ত্রিত হবে ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে। এই দুটোতে দুটো ‘ব্রেইন সফটওয়্যার’ আছে। বৈধ সংযোগ ছাড়া এগুলো কাজ করবে না।

তিনি বলেন, প্রচলিত ইজিবাইকে ব্যবহৃত অ্যাসিড ব্যাটারিতে খরচ পড়ে বেশি। পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। বাঘ চলবে লিথিয়াম আয়নে। এতে খরচ কম, পরিবেশবান্ধবও।

তিনি উল্লেখ করেন, একটি সিএনজিচালিত অটোতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ১ টাকা ৮০ পয়সা। ইজিবাইকে খরচ ২ টাকা ২০ পয়সা। বাঘ-এ খরচ হবে মাত্র ৭৫ পয়সা। ফলে ‘বাঘ’ নামলে যাত্রীদের ভাড়া কমবে। ইজিবাইকের প্রতিটি অ্যাসিড ব্যাটারিতে ১০ লিটার অ্যাসিড থাকে, ৫টি ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। মোট ৫০ লিটার অ্যাসিড লাগে। এই ৫০ লিটার অ্যাসিডের মেয়াদ মাত্র ছয় মাস। এরপর নতুন ব্যাটারি কিনতে হয়। আর প্রতিটি ইজিবাইক চালাতে বছরে ১০০ লিটার অ্যাসিড পানিতে ঢেলে দিতে হয়। এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

কাজী জসিমুল ইসমলাম দাবি করেন, অ্যাসিড ব্যাটারির সংস্পর্শে যারা থাকছেন, তাদের অধিকাংশরেই আগামী ১০ বছরের মধ্যে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ লাখ ইজিবাইক চলছে। চাইলে একদিনে এগুলো রাস্তা থেকে তুলে দেয়া যাবে না। তবে বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ‘বাঘ’ যখন চলতে শুরু করবে, তখন ইজিবাইক ধীরে ধীরে কমে আসবে।

তিনি আরো বলেন, ‘বাঘ’কে অনুমতি দেয়া হলে প্রতি বছর অন্তত ১০-১২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব বাড়বে সরকারের। এর ব্যাখ্যায় কাজী জসিমুল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে বছরে অন্তত ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল কমানো সম্ভব। অন্যদিকে অতিরিক্ত আরো ৩ হাজার কোটি টাকা পাওয়া সম্ভব। প্রচলিত ইজিবাইক বন্ধ হলে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে কার্বন ক্রেডিট-এর জন্য সরকার এই টাকা পাবে। প্রতিটি প্রচলিত ইজিবাইক বন্ধ হলে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে কার্বন ক্রেডিট-এর জন্য সরকার পাবে ১৫ ডলার করে। ২০ লাখ ইজিবাইক বন্ধ হলে পাবে ৩ হাজার কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রচলিত ইজিবাইকগুলো রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলে, এগুলোর রোড পারমিটও নেই। কোনও রাজস্ব পায় না সরকার। সেক্ষেত্রে ‘বাঘ’কে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসলে ফি বাবদ সরকার প্রতি বছর সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা আয় করতে পারবে। এ ছাড়া প্রতি বছর এক থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের ই-কর্মাসও হবে এর ফলে। সেখান থেকে রাজস্ব আসবে।

তিনি বলেন, ‘সরকার নীতিমালা দিলে আমরা প্রচলিত ইজিবাইকগুলো নিয়ে রিসাইকেল করতে পারি। এটাকে পরিবেশবান্ধব করে অ্যাপসের মাধ্যমে চালাতে পারবো। ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ইজিবাইক তো ফেলে দেয়া যাবে না।’

তিনি বলেন, যেহেতু অ্যাপসের মাধ্যমে চলবে, সেহেতু আমরা এগুলোকে পণ্য ডেলিভারির কাজেও লাগাতে পারবো। আমাদের টার্গেট, আগামী ২ বছরের মধ্যে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের ই-কর্মাস করা। দেশের প্রতিটি বাজারে অন্তত ৫০টি করে ইজিবাইক দাঁড়িয়ে থাকে। ‘বাঘ’ যখন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে তখন আমরা গ্রামগঞ্জের পোস্ট অফিসগুলোর ডেলিভারির কাজ করতে পারবো। এতে মানুষ সহজে ও অল্প খরচে যে কোনও জায়গা থেকে চাহিদামতো পণ্য পাবে।

তিনি বলেন, বাজাজ পৃথিবীর ৭০ ভাগ থ্রি হুইলার রপ্তানি করে। বাজাজ যেটা করে না, আমরা সেটা করতে চাই। সে কারণে আমি ‘বাঘ’ নিয়ে এসেছি। ‘বাঘ’-এর মধ্যে বসে টিভিও দেখা যাবে। ২০ লাখ বাঘ মানুষকে সেবা দেবে। রাস্তার এই বাঘ মানুষকে শিক্ষিত হতেও সহায়তা করবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের শতভাগ প্রতিফলন দেখা যাবে বাঘে।

তিনি বলেন, বাঘ উৎপাদনে প্রয়োজনে আরো ১২ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এ ছাড়া ইজিবাইকের ২০ লাখ মানুষের পাশাপাশি বাঘ তৈরিতে সম্পৃক্ত আরো অন্তত ১০ লাখ অর্থাৎ ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরাসরি বাঘ উৎপাদনে সম্পৃক্ত অন্তত ১২০০ মানুষ চাকরি পাবেন।

কাজী জসিমুল ইসলাম আরো বলেন, ‘বাঘ’ শুধু দেশের সড়কেই দাপিয়ে বেড়াবে না, বিদেশের সড়কেও দেখা মিলবে। বাঘ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাবে। দেশে বড় গাড়ির জন্য যে স্টিল ব্যবহৃত হয়, সেটা দিয়েই বাঘ তৈরি হবে। ফলে দুর্ঘটনায় সিএনজি অটোরিকশাকে যেভাবে দুমড়েমুচড়ে যেতে দেখা যায়, বাঘ-এ তেমনটি হবে না।

কাজী জসিমুল ইসলাম আরো বলেন, বাঘ রপ্তানি নিয়ে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কম্বোডিয়া, সুদান, সাউথ আফ্রিকা, ও ইথিওপিয়া ‘বাঘ’ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কোনও কারণে দেশের সড়কে বাঘের অনুমতি পেতে যদি দেরি হয়, তবে আগস্ট থেকে আমরা রপ্তানিতে যাব।

ইতিমধ্যে বাঘ রপ্তানির অনুমতি পেয়েছেন জানিয়ে বাঘ ইকো মোটরস-এর প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, গাজীপুরের হোতাপাড়ার কারখানায় ১ আগস্ট থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার ‘বাঘ’ উৎপাদন হবে।

দেশে থ্রি-হুইলারের জন্য এখন পর্যন্ত কোনও নীতিমালা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, যে কোনও সময় যদি দেশের সড়কে চালুর অনুমতি পাই, তবে ১৮০ দিনের মধ্যে উৎপাদনে যেতে পারবো।

আরো