পাহাড় জুড়ে কফি চাষের ধুম

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে পার্বত্য জেলাগুলোর পাহাড়ে সীমিত পর্যায়ে সনাতন পদ্ধতিতে যে কফি চাষ শুরু হয়েছিল, কৃষকের আগ্রহে এখন তা বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে।

পার্বত্য জেলাগুলো ছাড়িয়ে কফি চাষ ছড়িয়ে পড়েছে নীলফামারী, টাঙ্গাইল ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায়। অপ্রচলিত অর্থকরী এই ফসল চাষে উৎসাহ দিতে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রায় সোয়া ২০০ কোটি টাকার আলাদা প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকারের এ দুই প্রতিষ্ঠান।

শুধু তাই নয়, স্থানীয়ভাবে কফির জাত, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন আর কফি চাষে কৃষকদের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণের আওতা বাড়ানোসহ বেশ বড় কর্মযজ্ঞই শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, কফির বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হলে বিদেশ থেকে কফি আমদানি কমিয়ে উল্টো রপ্তানিতে চোখ রাখছে তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে কফির উৎপাদন এলাকা ছিল প্রায় ১১৮ দশমিক ৩ হেক্টর, মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ৫৫ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। দেশের চাহিদার ৯৫ শতাংশই মেটানো হয় আমদানি করা কফি দিয়ে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি করা গ্রিন কফির পরিমাণ ছিল ৩২.৫১৭ টন।

কেন ঝোঁক কফি চাষে

বাংলাদেশে দুই ধরনের কফির চাষ হচ্ছে এখন। একটি আফ্রিকার জাত কফিয়া ক্যানিফোরা, যা রোবাস্তা কফি নামে পরিচিত। অন্যটি কফিয়া অ্যারাবিকা; বিশ্বজোড়া তুমুল চাহিদার এই কফিটি পর্বত কফি নামেও পরিচিত বেশ।

পাহাড়ে স্থান ভেদে গাছের আকার আকৃতি ভিন্ন হয়। ফলনেও ভিন্নতা দেখা যায়। তবে প্রতি গাছে গড় ফলন হয় ৭ থেকে ১০ কেজি। সে হিসাবে প্রতি হেক্টরে রোবাস্তার ফলন সাড়ে সাত হাজার থেকে ১১ হাজার কেজি। আর প্রতি অ্যারাবিকার ফলন সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার কেজি।

রাঙামাটির রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, সেখানে এখন দুই জাতের কফির প্রায় দেড় শতাধিক চারা রয়েছে; যেখান থেকে সৌখিন কৃষকরা মাত্র ২০ টাকায় চারা সংগ্রহ করতে পারছেন।

বাগানে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আম, মাল্টা, কাঁঠাল, কমলা, কলা, আনারসের পাশাপাশি কফি কফি চাষেও সাফল্য মিলছে। আর এটাই কফিতে কৃষকের আগ্রহের মূল কারণ বলে মনে করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাঙামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক পবন কুমার চাকমা।

বান্দরবান সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় ৪৭৩ জন কৃষক ১২২ দশমিক নয় হেক্টর জমিতে কফি চাষ শুরু করেছেন। গত বছরে ৩৯ দশমিক ৩২ হেক্টর জমিতে ফলন পেয়েছেন তারা। সবমিলিয়ে এক লাখ চার হাজার ৫৮৯টি গাছ থেকে ৫৬ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন কফি বিন পাওয়া গেছে।

বান্দরবানে অ্যারাবিকা জাতের কফির চাষই বেশি হচ্ছে। সেখানে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন রুমা উপজেলার কৃষকরা। এ উপজেলার ৩৫০ জন কৃষক ৪৮ হেক্টর জমিতে ২৯ হাজার ৫৪৪টি গাছ লাগিয়ে ৩৯ দশমিক ১৫ মেট্রিক টন কফি বিন পেয়েছেন।

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুন্সী রশিদ আহমেদ জানান, তারা বিশ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে কফি চাষ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। এখন তার ফল মিলছে।

এ গবেষণা কেন্দ্রের এক একর জায়গায় রোবাস্তা জাতের ৩৯৫ ও অ্যারাবিকা জাতের ২০০টি গাছ রোপন করা হয়েছে। ফলন মৌসুমে প্রতিটি গাছ থেকে সাত-আট কেজি বিন পাওয়া যায়। গত মৌসুমে এই কেন্দ্র পেয়েছে ৪৫০ কেজি বিন।

“২০০৫ সাল থেকে আমরা নিয়মিতভাবে চারা উৎপাদন করে আসছি। গত বছর অবধি কফির চারার চাহিদা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজার। কিন্তু হঠাৎ সে চাহিদা বেড়েছে। এখন আমাদের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার চারা উৎপাদন করতে হচ্ছে। এমনকি আমাদের কাছ থেকে চারা নিয়ে একজন কৃষক কফি বিন উৎপাদনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার চারাও উৎপাদন করেছেন। এখন তিনি সেটা বিক্রি করতে চাইছেন। এভাবেই কফি চাষের বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে।”

মুন্সী রশিদ বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু বাণিজ্যিক কফি চাষের জন্য উপযোগী। অ্যারাবিকা জাতের জন্য তুলনামূলক বেশি উচ্চতার (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ ফুট) প্রয়োজন হয়। রোবাস্তা বাংলাদেশের সব ধরনের উচ্চতায় ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

নিজের কফি বাগানে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো বাজারের ছানোয়ার হোসেন।নিজের কফি বাগানে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো বাজারের ছানোয়ার হোসেন।২০১৬ সালে শখের বশে কফির চাষ শুরু করেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো বাজারের বাসিন্দা ছানোয়ার হোসেন। কলেজে শিক্ষকতা ছেড়ে কৃষি পেশায় মনোনিবেশ করা ছানোয়ার এখন দেশে কফি চাষের অন্যতম অগ্রদূত।

তিনি জানান, প্রথমে রাইখালী থেকে রোবাস্তা জাতের দুই শতাধিক চারা আনেন তার বাগানে। নয় বিঘা জমিতে রোপণ করা সেই গাছ থেকে তিন বছর পেরোতে তিনি ৭০ থেকে ৮০ কেজি বিন পান। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ কেজি বিন তিনি চারা করার জন্য রেখে দেন। বাকি বিন থেকে গুঁড়ো কফি তৈরি করেন।

“কফি চাষে আলাদা জমির প্রয়োজন পড়ছে না। একটু আবছায়া অঞ্চলেই কফির চাষ দারুণ হয়। বড় কোনো ফলদ বৃক্ষের পাশে অনায়াসেই কফির চারা বসানো যায়। ফল আসতে আসতে তিন বছর লাগতে পারে।”

তাকে দেখে এখন অনেকেই উৎসাহী হচ্ছেন জানিয়ে ছানোয়ার বলেন, “চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাকে এখন প্রায় ৫০ হাজার চারা উৎপাদন করতে হবে। পাশাপাশি গুঁড়ো কফির জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকেও চাহিদা আছে। প্রতি কেজি গুঁড়ো কফি আমি এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি করছি।”

কফির দেশি জাতের স্বপ্ন

কফির বাণিজ্যক উৎপাদন এগিয়ে নিতে স্থানীয়ভাবে কফির নতুন জাত উদ্ভাবনেও কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। নতুন জাতের নাম হবে বারি কফি-১।

খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুন্সী রশিদ আহমেদ বলেন, এ কেন্দ্রে ফলদানকারী রোবাস্তা ও অ্যারাবিকার গাছগুলো থেকেই নতুন অগ্রবর্তী লাইন তৈরির জন্য গবেষণা করছেন তারা।

“জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেতে গেলে অগ্রবর্তী লাইনের ফলন, রোগবালাই ও মান নিয়ে তিন বছর গবেষণা করতে হয়। আমরা সেটা সম্পন্ন করেছি। শিগগিরই আমরা এই প্রতিবেদন বারিতে পাঠাব। তারপর তা স্বীকৃতির জন্য মন্ত্রণালয়ে যাবে।”

রোবাস্তা ও অ্যারাবিকা প্রজাতি থেকে ভারত, ভিয়েতনাম ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে হাইব্রিড কফির নানা জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে ততটা উচ্চতর গবেষণার দিকে এখনও যায়নি পাহাড়ি গবেষণা কেন্দ্র।

মুন্সী রশিদ বলেন, “রোবাস্তার ফলন অ্যারাবিকার আড়াই গুণ বেশি। তবে অ্যারাবিকার ফ্লেভার ও টেস্ট রোবাস্তার চেয়ে ভালো, সেজন্য চাহিদাও বেশি। ক্যাফেইনের পরিমাণ রোবাস্তায় বেশি। আমরা ততটা অ্যানালিটিক্যাল কিছু করিনি এখনও। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের এখানে ল্যাব হয়ে গেলে আমরা ওই ধরনের গবেষণাগুলোও করব।”

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু তাহের মাসুদ বলেন, “আমরা নিবিড়ভাবে রোবাস্তা ও অ্যারাবিকার চাষ পর্যবেক্ষণ করেছি। এ দুই প্রজাতির গাছ থেকেই আমরা নতুন এক জাত বারি কফি-১ প্রস্তাবনায় আনছি। আরও কিছু পরীক্ষা বাকি আছে। তারপর নিয়মমাফিক উপায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যাবে।”

কফি সহজেই মিশ্র ফসল হিসেবে বনজ উদ্ভিদের সঙ্গে চাষ করা যায়। ফুল ফোটার সময় সেচ দিলে বেশি ফলন পাওয়া যায়। কফি গাছে রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি কম, তাই অল্প পরিচর্যায় এর চাষ সম্ভব।

জাতীয় বীজ বোর্ডের সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগের মহাপরিচালক বলাই কৃষ্ণ হাজরা বলেন, দেশীয় জাত এলে গাছের মৃত্যুহার অনেকাংশে কমে যাবে। তখন বেশি ফলন পাওয়া যাবে।

আর বারির মহাপরিচালক নাজিরুল ইসলাম বলেন, কফির দেশি জাত উদ্ভাবন হলে দেশের নানা প্রান্তে উৎপাদন বাড়ানো যাবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে তখন রপ্তানির কথাও ভাবা যাবে।

প্রযুক্তিও দিচ্ছে বারি

এখন যে সনাতন পদ্ধতিতে কফি উৎপাদন হচ্ছে, তাতে উৎপাদিত কফির বড় একটি অংশ অদক্ষতায় নষ্ট হয়। সেজন্য সহজ প্রযুক্তিও আনছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। পাশাপাশি কফি বাজারজাত করার কলাকৌশল শেখাতেও প্রশিক্ষণ জোরদার করা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুন্সী রশিদ বলেন, “কৃষকরা রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক পদ্ধতি জানেন না বলে তারা এখন প্রতি কেজি কফি বিন বিক্রি করছেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। কিন্তু তারা প্রশিক্ষিত হলে সেই বীজ তারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি করতে পারেন।”

কৃষকের জন্য বারি যেসব কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং (এফএমপিই) বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নূরুল আমিন।

তিনি বলেন, কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল এর বীজের লাল খোসা ছাড়ানো, যা হাতে করতে অনেক সময় এবং পরিশ্রম সাপেক্ষ। বারি উদ্ভাবিত পাল্পারের সাহায্যে ঘণ্টায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি কফির খোসা ছাড়ানো সম্ভব হয়। এর দাম পড়বে ২৫ হাজার টাকা।

কফি বিনের শুকনো খোসা ছাড়াতে ব্যবহার করা হয় কফি ডি-হলার। বারির তৈরি কফি ডি-হলারের দাম ৬০ হাজার টাকা।

কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে সবুজ কফিকে উচ্চতাপে ভাজা বা রোস্টিং করা। এর ফলে সবুজ কফিতে রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সুগন্ধ, রঙ ও স্বাদ তৈরি হয়। বাংলাদেশে কৃষকরা এ কাজটি সাধারণ চুলায় খোলা পাত্রে বা কড়াইয়ে করেন। তাতে ভাজার কাজটি ঠিকভাবে হয় না। বারি যে কফি রোস্টার তৈরি করেছে, তার দাম পড়বে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।

ভাজা কফি বিন গুঁড়ো করাও কফি বিপণনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সেজন্য বারি যে কফি গ্রাইন্ডার তৈরি করেছে, তার দাম তিন হাজার টাকা। এই মেশিনে একসঙ্গে পাঁচ কেজি বিন গুঁড়ো করা যাবে, সময় লাগবে ১০ মিনিট।

মধুপুরের কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, তিনি পাল্পিং ও গ্রাইন্ডার মেশিন দুটো কিনেছেন। কফি প্রক্রিয়াজাত করার মাঝের প্রক্রিয়াগুলো তিনি সনাতন পদ্ধতিতে করেন। তবে বারি গ্রাইন্ডিং মেশিনে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না।

“গ্রাইন্ডিং মেশিনে যতটা গুঁড়ো করতে চাই, ততটা পারি না। আরও মিহি করতে পারলে চাহিদা আরও বাড়ত।”

এ বিষয়ে মো. নূরুল আমিন বলেন, তারা তাদের প্রযুক্তির আরও উৎকর্ষ সাধন করবেন। প্রায় আড়াই লাখ টাকার এসব প্রযুক্তি কেনার মত কৃষক পার্বত্য অঞ্চলে নাও থাকতে পারে; সে বিবেচনায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিও দেওয়া হতে পারে।

আর বারির মহাপরিচালক নাজিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা কফির জাত অবমুক্ত করার পর প্রযুক্তিগুলোও কৃষকের জন্য সহজলভ্য করব। চাহিদা বাড়ছে কফি চাষের। নিশ্চয়ই এই প্রযুক্তিমূল্য কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন থাকে, আমরা নজর রাখব।”

আসছে দুই প্রকল্প

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-বারির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং উদ্যান তাত্ত্বিক ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ, চর এলাকায় উদ্যান ও মাঠ ফসলের প্রযুক্তি বিস্তার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আবু তাহের মাসুদ জানান, কফির আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বারি সম্প্রতি সোয়া ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কফি ও কাজু বাদাম চাষ পদ্ধতি ও কৃষক উন্নয়ন শীর্ষক একটি কর্মসূচির পরিকল্পনা নিয়েছে। একনেকের অনুমোদন পেলে দুই সরকারি দপ্তর তা বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পটি শিগগিরই একনেকে উঠবে জানিয়ে বারির মহাপরিচালক নাজিরুল ইসলাম বলেন, “কফি ও কাজুর বাণিজ্যিক চাষাবাদকে এগিয়ে নিতে এ প্রকল্পে আমরা বিস্তারিত তুলে ধরেছি।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য চারা ও জমি করে দেবে। পাশাপাশি বারি থেকে উদ্ভাবিত প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি তারা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেবে। প্রয়োজনে প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটও স্থাপন করবে।

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে মাটি পরীক্ষা ও রোগবালাই নির্ণয় করার ল্যাব প্রতিষ্ঠার কথাও রয়েছে এই প্রকল্পে। বান্দরবানে একটি কফি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কথাও সেখানে রয়েছে।

পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় টেকসই জীবনমান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নকল্পে দরিদ্র দুই হাজার কৃষক পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে কফি ও কাজুবাদামের বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব পরিবারকে চাষ পদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, মৌ চাষেও তাদের সম্পৃক্ত করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিয়য়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কফি ও কাজুবাদাম চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ শীর্ষক এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে করা হবে।

বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা এবং থানচি; রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই এবং জুরাছড়ি; খাগড়াছড়ি সদর, মানিকছড়ি ও মাটিরাংগা রামগড় উপজেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।

সম্ভাবনা কতটা?

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মেহেদি মাসুদ মনে করেন, পার্বত্য অঞ্চলে কফি চাষে সাফল্যের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার।

“কফি তো পাহাড়ের অনেক জায়গায় চাষ হচ্ছে। তবে আমার মতে, হাই অল্টিচিউডে অ্যারাবিকা, লো অল্টিচিউডে রোবাস্তা চাষ করতে হবে। কফি তো প্ল্যান্টেশন ক্রপ। কেউ বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে গেলে কমপক্ষে ২০০ একর জুড়ে করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে করে হবে না।”

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, “পাহাড়ে চাষ করতে গেলে প্রয়োজন বিশেষ সেচ পদ্ধতি। দুই পাহাড়ের মাঝে বাঁধ দিয়ে বৃষ্টির পানি আটকে রেখে তা দিয়ে সেচ পদ্ধতির কথা অনেকদিন আগে আমরা বলেছি। এখন সেই পদ্ধতিও জনপ্রিয় হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আবছায়া অঞ্চলের পাশাপাশি কফির জন্য সেচ খুব জরুরি।”

বাংলাদেশে কফিকে এখনও ‘ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে বর্ণনা করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা অনুষদের সাবেক ডিন ও কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির বর্তমান মহাসচিব মিজানুল হক কাজল বলেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে যদি কিছু প্রণোদনা দেওয়া যায়, ভবিষ্যতে সেটা লাভজনক হবে। আমরা আমদানি কমিয়ে আনতে পারব।”