মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শঙ্কা চরমে

স্টাফ রিপোর্টার, আউটলুকবাংলা ডটকম

সারাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি চলছে, সঙ্গে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে মৃত্যু। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ১৮ দফার নির্দেশনা দিয়েছে। এরইমধ্যে আগামী ২ এপ্রিল সারাদেশে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবকদের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যবিদদরাও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

জনসাস্থ্যবিদদের দাবি, এই সময়ে কোনওভাবেই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবার মতো পরিস্থিতি নেই। মানুষের জীবনের চেয়ে কোনও পরীক্ষাই মূল্যবান হতে পারে না।

এদিকে ৩১ মার্চ করোনাকালে বাংলাদেশে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত পাওয়া গেছে। এর আগে গত ২৯ মার্চ করোনাকালের সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড হয় বাংলাদেশে। সেদিন একদিনে শনাক্ত হন পাঁচ হাজার ১৮১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৫২ জন। এর আগে গত বছরের ২৬ আগস্ট মারা যান ৫৪ জন। সে হিসাবে গত সাত মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সংক্রমণের এমন পরিস্থিতিতে এক লাখ ২২ হাজার ৮৭৪ জন পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিয়েই আশঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, যেহেতু এবারে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা হচ্ছে তাই সব ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডার সুবিধাসহ আইসোলেশন কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, কোনও শিক্ষার্থীর যদি করোনার কোনও লক্ষণ উপসর্গ থাকে বা করোনাতে আক্রান্ত থাকেন তাহলে তার জন্য আইসোলেশন কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মাস্ক ম্যান্ডেটরি করা হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক এনায়েতুর রহমান বলেন, আর কেউ যদি কোনও কারনে মাস্ক না পরে আসে তাহলে তার জন্য কেন্দ্র থেকে মাস্ক সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল ( বিএমডিসি) থেকে যে স্বাস্থ্যবিধি আমাদের দেওয়া হয়েছে সেটা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা হবে।

আর কেবলমাত্র পরীক্ষার্থীই নয়, তাদের অভিভাবকদের জন্যও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছে অধিদফতর। প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে যেনো অভিভাবকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবস্থান করতে পারে ও তাদের বসার ব্যবস্থাও করবেন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে, ভর্তি পরীক্ষা স্বচ্ছতা ও স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রাখতে সরকারের পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা শাখা, শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল শাখা মিলে টিম-ওয়ার্ক ও কো-অর্ডিনেশনের মাধ্যমে কাজ করবে এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে ও কেন্দ্রের আশেপাশে এলাকার স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, আশা করা যায়, যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখেই এবারের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নির্বিঘ্নেই অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি আরও জানান, করোনার কারণে সকলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সংখ্যা ১৯টি এবং ভেন্যু সংখ্যা ৫৫টি করা হয়েছে। একই সাথে কেন্দ্রের ভেতরে পরীক্ষা চলাকালীন পরীক্ষার্থীদের ও কেন্দ্রর বাইরে অপেক্ষামান অভিভাবকদের স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে। পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে ফটোকপি মেশিনের দোকান বন্ধ রাখা, কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখাসহ অন্যান্য তৎপরতার দিকেও নজর দেয়া হয়েছে।

তবে এই পরীক্ষা কোনওভাবেই হওয়া উচিত নয় মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, যেখানে অনেক লোকের জমায়েত হবে সেখানে অবশ্যই এটা বন্ধ করতে হবে। কেবলমাত্র মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা বলেই এই পরীক্ষা হতে হবে-এমন কোনও বিধিবিধান থাকতে পারে না এবং হওয়া উচিত নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই, আইসিইউ সোনার হরিণ। সেখানে কেন এই ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের ১৮ দফার নির্দেশনার প্রথম নির্দেশনাবিরোধী এই সিদ্ধান্ত। যেখানে সরকার গণজমায়েত না করার জন্য বলেছে, সীমিতভাবে করার জন্য বলেছে, সেখানে ঢাকায়-যেখানে ভয়াবহ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে সেখানে কী করে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা হতে পরে।

আর কোনওভাবেই এসব পরীক্ষাতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব না, এটা আত্মঘাতী হবে, বলেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী একবছর যদি মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নাও থাকে তাহলে কী সমস্যা হবে। মানুষের বেঁচে থাকাটাই জরুরি এই মুহূর্তে, পরীক্ষা না।

এমনকী ভর্তি পরীক্ষাতে করোনা ইউনিটে কাজ করা চিকিৎসকদেরকেও ডিউটিতে রাখা হয়েছে। কী ভয়ংকর হতে পারে এটা মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদেরকে কীভাবে এখানে ডিউটিতে রাখা হলো, সে এক বিস্ময়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার জায়গাটা হয়তো কম ঝূঁকিপূর্ণ কিন্তু শিক্ষার্থীদের আসা যাওয়ার পথে, থাকার জায়গা যদি না থাকে তাহলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ঝূঁকির্পূণ জায়গাগুলো টার্গেট করে স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করতে হবে, নয়তো সংক্রমণ কমবে না। তবে রিস্ক এবং বেনিফিট বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই মুহূর্তে, বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

আরো