পবিত্র রমজানের উপহার

ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান

পবিত্র রমজান মাসের আরেকটা উল্লেখযোগ্য উপহার, ইবাদীর রোযা পালনে প্রবৃত্তির বা নাফসের অবৈধ চাহিদার ও শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সহজ করার জন্য আল্লাহ তা’আলা শয়তানকে শিকল দিয়ে আটকিয়ে রাখেন। এমতাবস্থায় যদি আমরা দৃঢ়চিত্তে চেষ্টা করি অবশ্যই নর-নারীর সংমিশ্রণে যে অশ্লীলতা বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আমাদের সমাজে থাকবে তা থেকে ইনশা আল্লাহ মুক্ত থাকা যাবে। কারণ চক্ষুদৃষ্টিকে সংযম করতে পারলে হৃদয়ের দৃষ্টি অতি সহজেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাতে আত্মিকভাবে পরিশোধিত হলে রমজানের পবিত্রতা সংরক্ষণ করে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে ইনশা আল্লাহ পরহেজগারী পদমর্যাদায় আরোহণ করা যাবে। তাতে রোযা পালনের উদ্দেশ্যের পরির্পূণতা লাভ করবে। দান-খয়রাত করে স্বার্থত্যাগী হওয়ার মনোবৃত্তি এবং ধন-সম্পদ উর্পাজনে অন্যায়-অবৈধ পন্থা থেকে দুরে থাকায় দরকার হয় আল্লাহ-সচেতন ও আল্লাহ-প্রেমী হৃদয়।

উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পবিত্র রমজানের রোযা উপহার দেয় প্রয়োজনীয় উপাদান। অতএব পবিত্র রমজান মাসের রোযা এবং আল-কুরআনের পবিত্র বাণীর অলৌকিক শক্তির মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে অর্থাৎ তারা পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পবিত্র রমজানের আগমনে পবিত্র আল-কুরআনের সাথে মুসলিম উম্মতের হৃদয়তা অন্য সময়ের তুলনায় বহুগুণে বেড়ে যায় তাতে অধিকাংশ মুসলিমদের জীবন যাপনে সৃষ্টি হয় আল্লাহ তা’আলার প্রেমের জাগরণ এবং হৃদয়ে সৃষ্টি হয় আল্লাহ সচেতনতায় আশা-ভরসা। সারা বছর প্রথাগত অভ্যাস ও জীবন ধারায় লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন আসে, সৃষ্টি হয় ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে আলাইনমেন্ট বা বিন্যাস তাতে পার্থিব জীবনের বহুমুখী আকর্ষণের গতিবেগ হয়ে যায় মন্থর, আর পরকালের চিরশান্তির জীবন হয়ে যায় মূখ্য তাই তার আর্কষণে মুসলিম উম্মত হয় উদ্দীপিত। এ জন্যই পবিত্র রমাযানে মুসলিম সমাজে অন্যায়-অবিচার, প্রতিহিংসা, হিংসা বিদ্বেষ বহুলাংশে হ্রাস পায়। প্রতিটা মসজিদে মুসল্লিদের পদাচরণে হয় মুখরিত, সৃষ্টি হয় নতুন ধরনের স্বর্গীয় অনুভূতি। তারাবির নামাযে আল-কুর’আনের পবিত্র বাণীর তেলওয়াত হৃদয়র্স্পশী সুমধুর সুরে জেগে উঠে মুসলিম উম্মতের অবচেতন আত্মা। তাতে তারা পার্থিব ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখ-শান্তির আকর্ষণ থেকে চিরশান্তি পরকালের আকর্ষণে ভুলে যান ধনী-গরীবের, শিক্ষিত অশিক্ষিতের, সামাজিক পদমর্যাদার বৈষম্য।

এইভাবে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববন্ধনের এবং ইসলামী মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। অতএব পবিত্র রমজান হতে পারে অমুসলিমদের জন্য ইসলামী মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানার একটা অন্যতম মাধ্যম। গ্রীষ্মকালের র্দীঘ দিনে, এমনকি দিনের বেলায় পানি পান না করে রোযা রাখায় অমুসলিম সহকর্মী ও বন্ধুদের কাছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হবে তাই তারা নানা ধরনের প্রশ্ন করবেন। তাই ইসলাম সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করার এই সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। কারণ আমরা অমুসলিম সমাজে বসবাস করছি এবং আমাদের সহকর্মীরাও অধিকাংশ অমুসলিম। কাজেই পবিত্র রমাযানে মুসলিম সমাজে সৃজিত শিক্ষণীয় আর্দশ এবং ইসলাম যে প্রকৃতপক্ষে শান্তির, নিরাপত্তার, আত্মসংযমের, স্বার্থত্যাগের এবং মানব জীবনের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা তা অন্যদের কাছে পৌছানোর দায়িত্ব রয়েছে আমাদের। অতএব বলা যায়, বরকতময় পবিত্র রমজানের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপহার হচ্ছে নিজের সহজাত প্রকৃতির [আল-ফিতরার] আচর-আচরণের এবং আল্লাহ তা’আলা মুখী ধ্যান-ধারণায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসলাম সম্পর্কে অন্যদের অবহিত করা।

পবিত্র রমজানের সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে লাইলাতুল-কদরের রাত, যে রাতে আল্লাহ তা’আলার নূর, পবিত্র বাণীর জ্যোতি আল-কুর’আন, লওহে মাহফুয [সংরক্ষিত কিতাব] থেকে নিকটবর্তী আকাশে আল্লাহ তা’আলা প্রেরণ করেন।

এ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, Allah sent the Qur’an down all at one time from the Preserved Tablet [Al-Lawh Al-Mahfuz] to the House of Might [Bytul-3 Izzah], which is in the heaven of this world. Then it came down in parts to the Messenger of Allah (SA) based upon the incidents that occurred over a period of twenty-three years.’{Ibn Kathir, Vol. 10, page/541}|

সূরা আলা’কের প্রথম পাঁচ আয়াত দিয়ে রাসূলের (সা.) কাছে হেরা পর্বতের গুহায় আল-কুর’আন নাযিল হওয়া শুরু হয়। এই মহিমান্বিত বরকতময় রাতের মর্যাদা এবং গুরুত্বের সাথে পার্থিবের কোন ধন-সম্পদের তুলনা হয় না। কারণ এই রাতকে আল্লাহ তা’আলা করেছেন হাজার মাস [৮৩ বৎসর ৪ মাস] থেকে শ্রেষ্ঠ। তদুপরি এই রাতে ইবাদত করতে কোনো ধন-সম্পদের প্রয়োজন হয় না। রাজা বাদশাহ, ধনী-গরীব, দিনভিখারী, সমাজপতি-রাষ্ট্র্রপতি, শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও প্রতিবন্ধি সকলের জন্যই রয়েছে এই বরকতময় রাতে আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে আসার অন্যতম সুযোগ। তাই বলা যায়, এই মহিমান্বিত রাত সবার জন্যই অমূল্য সম্পদ, এই সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত তাই অফুরন্ত। শুধু মুসলিম উম্মতই নয় বরং সমস্ত মানব জাতি এই সম্পদ ভোগ করলেও শেষ করতে পারবেন না। এই রাতের ইবাদত মুসলিম উম্মতকে দেয় চিরশান্তি জান্নাতের সুসংবাদ এবং অমুলিমদের দেয় আল-কুর’আনে বিশ্বাস স্থাপন করে হিদায়েত প্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ। এ জন্যই এই মহান রাতের মূল্যায়ন যথার্থভাবে করে মুসলিম উম্মতের কর্তব্য অন্যদেরকেও এই রাত সম্পর্কে অবহিত করা।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘১: আমি একে [আল-কুর’আনকে] নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। ২: লাইলাতুল-কদর সম্পর্কে তুমি কি জান? ৩: লাইলাতুল কদর হলো এক হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ। ৪: এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফিরেশতাগণ ও রূহ [জীব্রাইল (আ.)] অবর্তীণ হয় তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে। ৫: এটা নিরাপত্তা যা ফযরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’{আল কদর};

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন, ৩: আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সর্তককারী। ৮: এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞার্পূণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।’{৪৪-দোখান}।

শব-ই-কদরের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের নিয়াতে কদরের রাত্রিতে [ইবাদতে] দাঁড়ালো, তার আগেকার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’{সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ২, ১৮৭১}।

লাইলাতুল কদরে পাঠ করার অতিসহজ ও সংক্ষিপ্ত দোয়া সম্পর্কে আয়েশা (রা.) একদা জিজ্ঞাসা করলেন, “ও আল্লাহর রাসূল! আমি যদি লাইলাতুল-কদর পাই তাহলে আমার কি বলা উচিত [অর্থাৎ কিভাবে দোয়া করতে হবে]?” রাসূল (সা.) বললেন, “বল, আল্লাহুমা ইন্নাকা আফুও তুহেব্বু আফ্ওয়া ফা’আফু আন্নি” {বল, “ও আল্লাহ! বস্তুত, তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালবাস, সুতরাং আমাকে ক্ষমা কর”}। {আহমদ ৬:১৮২; ইবনে কাসীর, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫৪৮}। এই সহজ দোয়া দিন-রাতে যেকোন সময়ই পাঠ করা যায়।

এক হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ এই মাহাত্মপূর্ণ সম্মানের রাতে করা ইবাদত হচ্ছে ৮৩.৩ বৎসর যাবাত নিয়মিতভাবে করা ইবাদতের সমান বরং আরো বেশি। মুসলিম উম্মতের অধিকাংশই এত বয়স পর্যন্ত বেচেঁ থাকেন না। যারা এত দীর্ঘকাল বেচেঁ থাকেন, তারা যদি সারা জীবন একনিষ্ঠ অন্তরে আত্মর্সমপণী বান্দা হয়ে ইবাদত করেন তবুও এই রাতের ইবাদতের সমান হবে না। কারণ জীবনের প্রথম কয়েক বৎসর তাদের ইবাদত করার প্রয়োজন হয় না। এই রাতে ইবাদতে মশগুল থাকা অবস্থায় ইবাদীরা প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে এসে নিজের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এ রকম সুযোগ অন্য ধর্মাবলম্বী আদম সন্তানের আর কারও জন্য নাই। এ জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মুসলিমদের উচিত এই রাত অনুসন্ধানে একনিষ্ঠ নিয়াতে মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুতি নেয়া এবং সহজভাবে ইবাদত করার জন্য সবরকম ব্যবসস্থা গ্রহণ করা।

অতএব আমার বিশ্বাস সুস্থ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যবান ধীশক্তিসম্পন্ন উম্মতের যারা আখেরাতের প্রশান্তির জীবন প্রত্যাশা করেন তারা কেউ এই মহামূল্যবান রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত থাকতে রাজি হবেন না। কারণ এমনও হতে পারে এই রমজান মাসই হবে অনেকের পার্থিব জীবনের শেষ রমজান অথবা রমজান মাসেই মৃত্যু হবে। প্রতিবছরই দুই রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে বহু মুসলিম পরকালে চলে যান। অতএব এটা অত্যন্ত গুরুত্বর্পূণ বিষয়, তাই প্রতিটা মুসলিমের উচিত এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করা।

লাইলাতুল কদরের রাত যে রমজান মাসের একটা রাত তাতে কারও কোনো সন্দেহ নেই কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, রমজান মাসে আল-কুর’আন নাযিল করেছেন’ তবে রমজান মাসে এই রাতের অবস্থানের ব্যাপারে র্নিদিষ্ট তারিখ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতনৈক্য আছে। তবে সহীহ আল-বোখারীর এবং মুসলিম হাদিস থেকে জানা যায়, রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাত্রের যে কোনো রাতে লাইলাতুল কদর সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি। সুতরাং শুধুমাত্র ২৭ তারিখের রাতকে লাইলাতুল-কদরের রাত হিসেবে গণ্য করে ইবাদত করলে এই রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

কদরের রাতের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে রাসূল (সা.) স্বপ্নে দেখেছিলেন। কিন্তু তা তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই লাইলাতুল কদরের রাত অনুসন্ধান করার ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে স্বপ্নে শব-ই কদর দেখানো হয়েছিল। এরপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনেই তা তালাশ কর। আর তার খোঁজ কর প্রত্যেক বিজোড় রাত্রিতে।’{সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ২, ১৮৭৫; মুসলিম ২৬৩৮}।

শেষ দশদিনে ইবাদত করার জন্য পরিবারের সকলকেই রাসূল (সা.) তাগিদ দিয়েছেন। উম্মত হিসেবে আমরা তার (সা.) পরিবারের অর্ন্তভূক্ত। তাই শেষ দশদিনের ইবাদতের জন্য নিয়াত করে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে ইনশা আল্লাহ অপেক্ষা করবো।

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘যখন [রমজানের শেষ] দশদিন এসে যেত, তখন নবী (সা.) পরনের কাপড় মজবুত করে বাধঁতেন (অর্থাৎ দৃঢ়তার সহিত প্রস্তুতি নিতেন)। রাত্রে স্বয়ং জাগতেন এবং পরিবারের লোকজনকেও জাগাতেন।’{সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ২, ১৮৮২}।

একনিষ্ঠ অন্তরে সঠিকভাবে পবিত্র রমজানের রোযা পালন করলে পরকালে আরো উপহার দিবে আর-র‌্যাইয়ান নামক দরজা দিয়ে আল্লাহ তা’আলার রহমত চিরশান্তির বেহেশতে প্রবেশ করার সুযোগ। রোযাদার ব্যতীত আর কেউ এই গেট দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘বেহেশতে র‌্যাইয়ান নামক একটা সদর দরজা আছে। রোজ কিয়ামতে এ দরজা দিয়ে রোযাদার ব্যক্তিরা বেহেশতে প্রবেশ করবে। তারা ব্যতীত এ দরজা দিয়ে আর কেউ তাদের সাথে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা কোথায়? তখন তারা এসে ঐ দরজা দিয়ে বেহেশতে ঢুকবে। তাদের সর্বশেষ লোকটি ঢুকার পরেই ঐ দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অতঃপর আর কোনো লোক ঢুকতে পারবে না।’ {সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ২, ১৭৬১; মুসলিম ২৫৭৯}। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধের বিধিনিষেধ অবলম্বনে রোযা পালন করলে ইনশা আল্লাহ উক্ত দরজা দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করার সুযোগ আমরা পাবো। কারণ রোযাদারের জন্য যে পুরস্কার রয়েছে সেটা একমাত্র আল্লাহ তা’আলা ব্যতিরেকে আর কেউ জানেন না। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে।

সঠিকভাবে রোযা পালনের নিয়মাবলীর বিস্তারিত বর্ণনা এই লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ফিকাহ আস-সুন্নাহতে বিস্তারিতভাবে রোযা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তদুপরি বর্তমানে ইন্টার নেটের বিভিন্ন ওয়েভ সাইটে এ ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে আলোচনা আছে। তা সত্ত্বেও সেহরী খাওয়া এবং ইফতার সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো। সেহরী খাওয়ার তাৎপর্য সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেহরী খাও। কেননা তাতে বরকত রয়েছে।’ আরো বলেছেন, ‘আমাদের এবং আহলে কিতাবীদের রোযার মধ্যে তফাৎ হলো সেহরী খাওয়া।’ {সহীহ মুসলিম ২৪১৮, ২৪১৯}। ইফতারের সময় হলে তাড়াতাড়ি ইফতার করা উত্তম। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘লোকেরা যত দিন তাড়াতাড়ি ইফতার করবে তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ আরো বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা তাড়াতাড়ি ইফতার করে তারাই আমার বেশি প্রিয়/প্রিয়া।’ {সহীহ মুসলিম ২৪২৩; তিরমিযী ৬৫১, ৬৫২}।

উত্তর আমেরিকায় এবারের রোযা হবে প্রায় ১৭-১৮ ঘন্টার। তাই এত র্দীঘ দিনের রোযা সহজভাবে করতে সেহরীতে প্রোটিন ও চর্বি এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া ভালো। তবে মিষ্টি শরবত দিয়ে ইফতার না করা ভালো। তেলে ভাজা বিভিন্ন পদের খাবার না খাওয়া উচিত। উপরোন্ত এগুলো তৈরি করতে মা-বোনদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়, এই সময়টা তারা ইচ্ছা করলে আল-কুর’আন পাঠ অথবা তসবিহ-তাহলীল করে পার করতে পারেন। রাসূল (সা.) খেজুর অথবা শুধুমাত্র পানি দিয়ে ইফতার করতেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রোযা রাখে, তখন সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। আর সে যদি খেজুর না পায়, তবে সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কেননা পানি পবিত্র।’ {সুনানে আবু দাউদ ২৩৪৭}।
এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রাত জেগে ইবাদত করার ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই কম পরিমাণে খেতে হবে তাতে গ্রীষ্মকালের র্দীঘ দিনের রোযায় ক্লান্ত শরীরে অলসতা সৃষ্টি হবে না। উল্লিখিত কাজগুলো বস্তুতঃ আত্মসংযমের অর্ন্তভূক্ত।

পবিত্র রমজানের আরো উপহার হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে আসার জন্য ইতেকাফে বসার সুযোগ। রাসূল (সা.) প্রতি রমজানেই শেষ দশদিনে ইতেকাফে বসতেন। আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘নবী (সা.) রমজানের শেষ দশদিনে ইতেকাফে বসতেন। এমনকি (এভাবেই) আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিলেন। তারপর তার স্ত্রীগণও ইতেকাফে বসতেন।” {সহীহ আল-বোখারী, খন্ড ২, ১৮৮৪}। অতএব যাদের আর্থিক সামর্থ্য ও সময় আছে, তারা অবশ্যই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবেন না। ইতেকাফের নিয়মাবলীও ফিকাহ আস-সুন্নাতে বিস্তারিতভাবে দেয়া আছে।

পবিত্র রমজানের শেষে আসে অতি আনন্দের বিশেষ দিন, ঈদের দিন। ঈদের সাথে রয়েছে স্বর্গের সম্পর্ক। কারণ আল্লাহ তা’আলার স্বর্গীয় আদেশেই মুসলিম উম্মত রোযা পালন করেন। ঈদের দিনে কোনো মুসলিমই যেন আনন্দ থেকে বঞ্চিত না থাকেন, তার জন্য ইসলাম দিয়েছে জাকাতুল ফিতর আদায় করার বিধান। ঈদের নামায পড়ার র্পুবেই এটা আদায় করতে হয়। তাই এই দিনের আনন্দে উম্মতের ধনী-গরীব, ছোট-বড়, একসাথে একাত্ম হয়ে একই উদ্দেশ্যে নিজস্ব এলাকায় এক জায়গায নামায আদায় এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করতে শরিক হন, যার দ্বিতীয় কোনো নজির আর কোনো ধর্মে পাওয়া যাবে না।

এদিনের আনন্দের সাথে জড়িত রয়েছে স্বর্গীয় প্রশান্তির আনন্দ। কারণ আল্লাহ তা’আলার আদেশে আল্লাহ তা’আলাকে সস্তুষ্ট করে মুত্তাকী মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই মুসলিম উম্মত রোযা পালন করেছেন। তদুপরি এই আনন্দের সাথে আরো জড়িত আছে পরিশুদ্ধ হৃদয়ের আধ্যাত্মিক অনুভূতি এবং পার্থিব জীবনে পুরস্কার হিসেবে সামান্য উপভোগ। কারণ সারা মাস রোযা পালন করতে গিয়ে মুসলিম উম্মত যে আত্মসংযমী আচরণ গ্রহণ করে, অর্থ-সম্পদ দান-খয়রাতে স্বার্থত্যাগী হয়েছিলেন, গ্রীষ্মকালের র্দীঘ দিনের প্রখর রৌদের তাপে ও আদ্রতায় তৃষ্ণার্ত হয়েছেন তবুও আল্লাহপ্রেমী বান্দা হওয়ায় পানি পান করেননি। তার প্রতিদানে পার্থিবে সামান্য পুরস্কার, আখেরাতের পুরস্কার হবে ইনশা আল্লাহ আরো বহুগুণে বড়। পবিত্র রমজানের উপহারগুলোর সদ্ব্যবহার করে আমরা সকলেই যেন পবিত্র রমজানের উদ্দেশ্য পরহেজগারী মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহ-সচেতনতায় জীবন-যাপন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি, এটাই হবে ইনশা আল্লাহ আমাদের প্রত্যাশা এবং দৃঢ় সংকল্প ও একনিষ্ঠ নিয়াত।

ঈদের পর শাওযাল মাসে ছয়দিন নফল রোযা করার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসের ছয়দিন রোযা রাখা হচ্ছে সারা বছর রোযা রাখার ন্যায়।’ {সহীহ মুসলিম, ২৬২৭}। রমজানের ৩০ রোযা এবং শাওয়ালের ছয় রোযা মিলে হয় ৩৬ রোযা। প্রতি রোযার জন্য কমপক্ষে দশগুণ সওয়াব দেয়া হবে, অর্থাৎ ৩৬ দিনের জন্য ৩৬০ দিনের সওয়াব পাওয়া যাবে। চাঁেদর বছর হয় ৩৬০ দিনে। সওয়াবের পরিমাণ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দার প্রত্যেক আমল দশগুণ থেকে সাতশতগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়।’{সহীহ মুসলিম, ২৫৭৬}। পরিশেষে সবার প্রতি রইলো পবিত্র রমজানুল মোবারক।

“হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার নিয়ামত পবিত্র রমজান মাসকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। এই মহান মাসের প্রতিটা মূর্হূত যেন তোমার যিকির এবং ইবাদতে আমরা কাটিয়ে দিতে পারি, সে রকম মানসিক শক্তি এবং দৃঢ়চিত্তে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদেরকে সমৃদ্ধ কর। পবিত্র রমজানের যথার্থ সম্মান যেন আমরা দিতে এবং সঠিকভাবে রোযা পালন করে তোমার আত্মর্সমপণী বান্দা হতে পারি সে রকম যোগ্যতা আমাদেরকে দাও। তোমার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত যে সমস্ত বান্দা আছেন, তাদের সাথে সামিল হওয়ার জন্য মুত্তাকী মর্যাদায় উন্নিত হতে আমাদের তাওফিক দান কর। আমাদের প্রার্থনা কবুল করে আমাদেরকে ক্ষমা কর, আমিন।

লেখক: ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান (আইওয়া, যুক্তরাষ্ট্র)

আরো