ফিতরা দেয়া কী আবশ্যক নাকি না দিলেও চলে?

স্টাফ রিপোর্টার, আউটলুকবাংলা ডটকম

রামাদান শেষ হলেই উঠবে ঈদের চাঁদ! আর ঈদের চাঁদ উঠলেই ফরজ হয়ে যায় সাদাকাতুল ফিতর দেওয়া যাকে আমরা ‘ফিতরা’ নামে চিনি।

ফিতরা কেন দেবেন?

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত; রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোযাদারের অনর্থক কথাবার্তা ও অশালীন আচরণের কাফ্‌ফারাস্বরূপ এবং গরীব-মিসকীনদের আহারের সংস্থান করার জন্য সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা) নির্ধারণ করেছেন।
[আবূ দাউদ ১৬০৯, বায়হাকী ৪/১৯৭]

আমরা যেটাকে ফিতরা বলি তার ভালো নাম সাদাকাতুল ফিতর। এটা দিতে হয় রামাদানের শেষে। মূলত এটা রোযার কাফফারা- সিয়াম থেকে আমরা যে ভুলগুলো করি, এই দান সেটাকে মিটিয়ে দেবে, আমাদের সিয়ামগুলোকে সুরক্ষা দেবে।

এর একটা সামাজিক প্রেক্ষাপটও আছে। ঈদের দিন যেন কেউ অভুক্ত না থাকে, যার সামর্থ্য আছে তার উপর যেহেতু সাদাকাতুল ফিতর দেয়া ওয়াজিব তাই এর মাধ্যমে প্রচুর খাবার হাত বদল হবে এবং প্রায় সবার ঘরেই কিছু না কিছু খাবার থাকবে। ফলে ঈদটা আসলেই উৎসবের মতো হবে।

ফিতরা কী নাকি না দিলেও চলে?

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত; মুসলিমদের প্রত্যেক আযাদ, গোলাম পুরুষ ও নারীর পক্ষ হতে সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর অথবা যব-এর এক সা’ পরিমাণ আদায় করা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরয করেছেন।
[সহীহ বুখারী, ১৫০৪]

ফিতরা কখন দেবেন?

(আবদুল্লাহ্‌) ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত; নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদেরকে ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন।
[সহীহ বুখারী, ১৫০৯]

ইব্‌নু আব্বাস হতে বর্ণিত, সাদাকাতুল ফিতর যে সালাতের পূর্বে আদায় করবে সেটা মকবুল বা গ্রহণযোগ্য। আর যে সালাতের পরে আদায় করবে সেটি সাধারণ সাদাকার মত।
[আবু দাউদ ১৬০৯, ইব্‌নু মাজাহ ১৮২৭]

ফিতরা কী দিয়ে দেবেন?

আবূ সা’ঈদ খুদ্‌রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ঈদের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করতাম। আবূ সা’ঈদ (রাঃ) বলেন, আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।
[সহীহ বুখারী, ১৫১০]

এই হাদিসের আলোকে ইসলামি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১৪৪২ হিজরি সালের জন্য বাজারমূল্য হিসেব করে বলেছে –

” উন্নতমানের গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা’ বা ১ কেজি ৬শ’ ৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৭০ (সত্তর) টাকা,

>> যব দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩ শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৮০ (দুইশ আশি) টাকা,

>> কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১,৩২০ (এক হাজার তিনশ বিশ) টাকা,

>> খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩ শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১,৬৫০ (এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ) টাকা,

>> পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩ শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২,৩১০ (দুই হাজার তিনশ দশ) টাকা ফিতরা প্রদান করতে হবে। “

এর পরে ইসলামি ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলা হয়েছে যা আমরা অনেকেই উপেক্ষা করে যাই।

” মুসলমানরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী উপরোক্ত পণ্যগুলোর যে কোন একটি পণ্য বা এর বাজার মূল্য দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। ”

সামর্থ্য কাকে বলে?

চলুন আমরা কিছু প্রেক্ষাপট দেখি–

১। চালের দাম ৫০ টাকা কেজি পার হয়ে গেছে। যা আপনার সামর্থ্যের বাইরে। আপনি দুই বেলা রুটি বা ময়দা-গোলা খাচ্ছেন। অথবা, খুঁজে ফিরছেন কোথায় আরো কমে চাল পাওয়া যায়। আপনি ফিতরা দিবেন পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্য ১৫০/- টাকা করে।

২। আপনি আপনার বাচ্চাকে নিয়মিত দুধ খাওয়ান নয়ত সরোবরের তালবিনা। আপনার জন্য সদস্য প্রতি ফিতরা ৩০০ টাকা।

৩। পায়েস আপনার ভারি পছন্দ। ঘন ক্ষীরে ভেসে থাকা কিশমিশ। অথবা পুডিং আপনি প্রায়ই খেয়ে থাকেন। দোকান থেকে ৫০০ টাকা কেজি মিষ্টি কিনতে আপনার সমস্যা হয় না, আল্লাহ আপনাকে সেই সামর্থ্য দিয়েছেন। কত ফিতরা দিবেন – ৬০০ টাকা মাথা পিছু দিন – গরীবরাও ঈদের দিন মিষ্টি খাক।

৪। ইফতার করছেন মারিয়াম বা মাবরুম খেজুর দিয়ে। সাহরিতে মাঝে মাঝে ভারি খাবার খেতে ইচ্ছে না করলে খেজুর খান। মাঝে মাঝেই আজওয়া খেজুরও কেনেন। সেক্ষেত্রে মাথাপিছু ১২০০ টাকা দিয়েন।

৫। পিৎসা আপনার খুব পছন্দের খাবার। অথবা আপনি কিটো ডায়েট করছেন – ভাত-রুটি-শর্করা খান না। প্রোটিন আর ফ্যাট। পনির – চীজ আপনার ভালো লাগে। প্রয়োজন এ খেয়ে থাকেন। বাটার – ঘি কেনেন আপনি। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন আপনার। মাথাপিছু ২৫০০ টাকা দিলেও আপনাকে দিতে হবে ১২৫০০ টাকা মাত্র। আপনার আয়ের তুলনায় এটা সামান্যই। আল্লাহ আপনাকে প্রিমিয়াম আয় প্যাকেজে রেখেছেন – আপনি আল্লাহর বান্দাদের দেয়ার সময় ঠিক এমনটাই দিবেন। কারণ বান্দা নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও ঠিক তাই করে।

ফিতরা কী টাকা না খাবার দিয়ে দিতে হবে?

আবূ সা’ঈদ খুদ্‌রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ঈদের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করতাম। আবূ সা’ঈদ (রাঃ) বলেন, আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।
[সহীহ বুখারী, ১৫১০]

>> ইমাম শাফেয়ীর মতে উত্তম হলো, হাদীসে বর্ণিত বস্তুর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা দেয়া।

>> ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত খেজুর ‘আজওয়া’ খেজুর দেয়া উত্তম।

>> ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা ভালো।

[আলমুগনী ৪/২১৯; আওজাযুল মাসালিক ৬/১২৮]

>> ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, অধিক মূল্যের দ্রব্যের দ্বারা ফিতরা আদায় করা ভালো। অর্থাৎ যা দ্বারা আদায় করলে গরীবের বেশি উপকার হয় সেটাই উত্তম ফিতরা।

<<>> শাইখ উছাইমীন (রহঃ) ‘আশ-শারহুল মুমতি’ (৬/১৮৩) গ্রন্থে বলেন, সঠিক মতানুযায়ী, যেটা খাদ্য হিসেবে প্রচলিত সেটা শস্যদানা হোক, ফল-ফলাদি হোক কিংবা গোশত হোক সেটা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয।

অন্যদিকে হানাফী আলিমদের মতামত হচ্ছে, টাকা অর্থাৎ খাবারের মূল্যমান দিয়েও ফিতরা আদায় করা জায়েজ।

আমাদের প্রথম এবং প্রাথমিক অনুরোধ থাকবে আপনারা পরিবারের জনপ্রতি ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (বিভিন্ন মতের মধ্যে এটা সর্বোচ্চ, তাই গরীবদের জন্য অধিক ইহসানের) খেজুর, কিসমিস বা চাল কিনুন। বাসার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট ছোট প্যাকেট করুন। আপনার বাসার চারপাশের গরীব মানুষদের খুঁজতে বের হন। দরকার হলে আপনার সন্তানদের নিয়ে তাদের বাসায় যান। অনুভব করুন, আল্লাহ আপনাকে কতটা ভালো রেখেছেন। এবার সেই ঈদ উপহার প্যাকেটগুলো ওই মানুষদের দিয়ে আসুন।