হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প

মীর খায়রুল আলম

বাংলার রূপ-মাধুর্য আর নান্দনিক শিল্প-সৌকর্যের সমন্বয়ে অপূর্ব সৃষ্টি তাঁতবস্ত্র প্রাচীনকাল থেকেই গোটা বিশ্বকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। বাংলার বস্ত্রের অসাধারণ বুনন, সৌন্দর্য, রঙের শৈল্পিক ব্যবহার, কাকাজ, নমনীয়তা ও স্থায়িত্বের বিবেচনায় তা বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তাঁতশিল্পীদের হাতে তৈরি প্রায় স্পর্শাতীত অদৃশ্য ও অবিশ্বাস্য সুন্দর মিহি সুতার মসলিন এক সময় ছিল গোটা বিশ্বের বিস্ময়।

মসলিন ছিল বিশ্বের সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, ধনী আর অভিজাত শ্রেণির মর্যাদার প্রতীক। বাংলার তাঁতশিল্পীদের সুনিপুণ ও সৃষ্টিশীল বস্ত্র সেকালে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং তা সুপ্রাচিনকাল থেকে মধ্যযুগের শেষ আঠারো শতক পর্যন্ত বিশ্ববাণিজ্যে একচেটিয়া দখল করে রাখে।

বাংলার তাঁতবস্ত্রের প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় মিসরে ফারাও সম্রাটদের মমির আবরণে মসলিনের ব্যবহার দেখে। খ্রিস্ট-পূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে উন্নতমানের সুতিবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বঙ্গের সুখ্যাতির তথ্য পাওয়া যায়। রামায়ণেও বঙ্গের বস্ত্রের উলেখ রয়েছে। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে বাংলার মসলিন রোম সম্রাটজ্যে বিশেষ খ্যাতি ও মর্যাদা লাভ করে।

জ্ঞানীদের মতে, ব্যাবিলন ও অ্যাসিরীয় সভ্যতায় বাংলার বস্ত্র, বিশেষ করে ঢাকাই মসলিন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। বাংলার প্রাচীন সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃত চর্যাপদে রয়েছে বাংলার তাঁতিদের জীবন রয়েছে। কাজের গতি-প্রকৃতি এবং তাদের পেশার শৈল্পিক উপস্থাপনা ইত্যাদি নানা বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। মধ্যযুগে পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপে প্রচুর পরিমাণে তাঁতবস্ত্র রফতানি হতো। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় তখন বাংলার, বিশেষ করে বর্তমান ঢাকা অঞ্চল ছিল বয়নশিল্পের প্রধান কেন্দ্র। তবে মুঘল আমলে বস্ত্র বাণিজ্য সংগঠিত রূপ ও বয়নশিল্পের চরম উৎকর্ষ লাভ করে।

মুঘলরা তাঁতশিল্প, বিশেষ করে মসলিন তত্ত্বাবধায়কদের জন্য একটি সরকারি পদ সৃষ্টি করে, যার পদবি ছিল ‘দারোগা ই-মলবুস খাস।’ মুঘল শাসনামলে বিক্রমপুরে রসকেরা ঢাকায় গড়ে তুলেছিল তাঁতশিল্প এলাকা। পুরান ঢাকায় তাঁতিবাজার নাম নিয়ে যা আজও টিকে আছে। সেই তাঁতশিল্প এলাকা তাঁতিবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মুঘল সুবেদার ইসলাম খান নামে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বস্ত্র ব্যবসা কেন্দ্র ইসলামপুর।

পণ্ডিতরা মনে করেন, বাংলার তাঁতশিল্পের বয়স কম করে হলেও আড়াই হাজার বছর। আঠারো শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বাংলার বিখ্যাত তাঁতশিল্প ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ে। ইউরোপের কলকারাখানায় উৎপাদিত বস্ত্র উনিশ শতকের দিকে অবাধে ভারতবর্ষে প্রবেশ করতে নীতি গ্রহণ করার ফলে ইউরোপীয় বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে বাংলার তাঁতশিল্পের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই উনিশ শতকের মতো এখনো তাঁতশিল্পকে লড়তে হচ্ছে বিদেশি বস্ত্রশিল্পের বিরুদ্ধে। একা একা নিজে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে অবশেষে এই একুশ শতকে এসে তাঁতশিল্প নিজের অস্তিত্বের শেষটুকু টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হারাচ্ছে সাতক্ষীরা জেলায়।

অতীতে সাতক্ষীরা বিভিন্ন উপজেলা গুলোতে এই কারুকাজ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি উপজেলা ছাড়া এ কাজ হয় না। তবে তার অধিক অংশই গজ বেন্ডেজ আর দু’একটি গামছা বুনন করা হয়। কিন্তু আগের দিনে প্রায় প্রতিটি এলাকায় তাঁতের কাজ করা হতো। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে অতলগর্ভে। যুগের সাথে তালমিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানান প্রযুক্তির উন্নত যন্ত্রের অর্বিরভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে তাঁতশিল্প।

এমনটি জানালেন সাতক্ষীরার নলতা গ্রামের তাঁতশিল্পী নুর মোহাম্মদ জানান, তাঁতিদের এক সময় দিনরাত ঘুম হতো না কাজের চাপে। তবে এখন আর কাজনেই নতুন নতুন কলকারখানা আবিষ্কারে আমাদের প্রচলন কমে গেছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের কাজ। তাইতো এখন আমরা গজ বেন্ডেস ছাড়া আর কিছু বোনা হয় না। দিন ২৫-৩০ পিসের মতো গজ কাপড় বোনেন তিনি।

দেবহাটার মোস্তাফিজুর রহমান বাবু কারিগর বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষের আদি পেশা ছেড়েছেন প্রায় সবাই। এ পেশার প্রচলন না থাকায় সবাই ভিন্ন পেশায় অংশ নিচ্ছেন। তাছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রভাবে তাঁত শিল্প নেই বললে চলে। হাতে গোনা কিছু পরিবার এখনো আগের পেশা টিকিয়ে রেখেছে। তবে তারাও হয়ত এ পেশা ছেড়ে দিবে। কারণ জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লাভের পরিমাণ নেই। কিন্তু বর্তমান এ পেশার মানুষেরা টিকে আছে গজ ব্যান্ডেস তৈরি করে।

আহম্মদ কটন ফ্যাক্টারির পরিচালক আবু আহম্মেদ জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে কারিগরদের তৈরি করা গজ ব্যান্ডেস নিয়ে এসে সেগুলো পরিস্কার করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরবাহ করেন তিনি। কিন্তু আগের দিনের মতো এখন আর তাঁত নিয়ে আগ্রহ নেই কারিগরদের। অনেকে শুধু গজ ব্যান্ডেস তৈরি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।

যদি এ পেশার মানুষদের সরকারি ভাবেকোনো সহায়তা করা যায় তাহলে ঐতিহ্যবাহী পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে।তাই সকলের দাবি ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরাকারি-বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক