গত অর্থবছরের ১১ মাসে লক্ষ্যের দ্বিগুণ বিক্রি সঞ্চয়পত্র

অনলাইন ডেস্ক, আউটলুকবাংলা ডটকম

বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১১ মাসেই (জুলাই-মে) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিক্রির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। তবে এই সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের মোট ৩০ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে। আর এই টাকা হলো জনগণের করের টাকা।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বিদায়ী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে গত এপ্রিলে এসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করা হয়।

এর বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, যা তার আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১৪ হাজার ৪২৪ কোটি টাকার নিট বিক্রির তুলনায় তিন গুণের কাছাকাছি।

মাসিক গড় বিক্রির প্রবণতা পর্যালোচনায় এমনটা ধারণা করা হচ্ছে যে পুরো অর্থবছরের হিসাব চূড়ান্ত হলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট ৯৯ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র জমা হয়েছে। এর মধ্যে মূল টাকা পরিশোধ করা হয়েছে ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘১১ মাসে ৩০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা পরিশোধের অঙ্কটা অনেক বেশি। অথচ পরিমাণটা স্রেফ অর্ধেক করে ফেলা যায়। সে ক্ষেত্রে দুই বছরে যে সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো আরেকটি সেতু তৈরি করা সম্ভব। রাজনৈতিক কারণে সরকার এ ব্যাপারে চুপ আছে এবং বাজারের সঙ্গে সংগতি না রেখে অস্বাভাবিক সুদের হার বজায় রেখেছে।’

সরকার ব্যাংক, সঞ্চয় ব্যুরো ও ডাকঘরের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। সঞ্চয় অধিদপ্তরের মে মাসের বিনিয়োগ বিবরণীতে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। এরপর ডাকঘরের মাধ্যমে। সবচেয়ে কম পরিমাণ বিক্রি করে সঞ্চয় ব্যুরো। যেমন আলোচ্য ১১ মাসে মূল জমার পরিমাণ ছিল এ রকম—ব্যাংকের মাধ্যমে ৬৫ হাজার ৩৬৮ কোটি, ডাকঘরের মাধ্যমে ৩৩ হাজার ২৭৫ কোটি ও সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে ৭ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে ১৪ হাজার ৫৭৯ কোটি, ডাকঘরের মাধ্যমে ১২ হাজার ২৯৭ কোটি ও সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে ৩ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার মুনাফা পরিশোধ হয়।

আলোচ্য সময়ে ব্যাংক যেখানে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে ৪৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার, সেখানে সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে হয়েছে ৬৭৯ কোটি টাকা। এবারে অবশ্য নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ডাকঘরের অবস্থা নেতিবাচক। ডাকঘরকে অনলাইন পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরিভাবে যুক্ত করতে না পারার কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন। সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার যে পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করতে চায়, কেনার চাপ থাকে বলে প্রতিবছরই তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই চাপ কমাতে মাঝখানে সরকার কিছু নীতি–পদক্ষেপ নিলেও মুনাফার হারে হাত দেয়নি।

সরকারি নীতি–পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে: অর্থ বিভাগের অধীনে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক সফটওয়্যারের সহায়তায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হচ্ছে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে। ওই সময় থেকেই সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার বাড়ানো হয়। নিয়ম করা হয় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ। আর বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকার বেশি হলেই উৎসে কর ১০ শতাংশ। এ ছাড়া ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের একটি করে ব্যাংক হিসাব থাকাও বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে চলতি অর্থবছর থেকে ২ লাখ টাকার অধিক মূল্যের সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন লাগবে।

এরপরই সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমতে থাকে। তবে বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা আবার সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়তে থাকে। গত মে মাসে আরেকটি পদক্ষেপ নিয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। বলা হয়, এখন থেকে কোনো ব্যাংকের শাখা বা ডাকঘর থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র আর কেনা যাবে না। এটা কিনতে হবে শুধু জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতাধীন সঞ্চয় ব্যুরো থেকে।বর্তমানে দেশে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত আছে। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের হার এখন ৫ থেকে ৬ শতাংশ।

দেশের একশ্রেণির মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। তাঁদের কথা চিন্তা করে উচ্চ সুদের পক্ষে অনেকে মত দেন। কিন্তু মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, ব্যবসায়ীরাও যে এই উচ্চ সুদ ভোগ করছেন, সেটি দূর করার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ সরকারের কাছ থেকে আসেনি। এ নিয়ে অর্থ বিভাগের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে আলোচনা উঠলেও অজ্ঞাত কারণে তা থেমে গেছে।

আরো