নির্বাচন কমিশন: সংবিধানই পথ দেখাতে পারে

এম হাফিজ উদ্দিন খান

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হবে। দেশের ৫৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। আমরা জানি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ সংবিধানে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ‘আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে’ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের নির্দেশ থাকলেও আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সরকারই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এই যে বছরের পর বছর সংবিধানের বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটেই চলেছে, এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে?

দেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় ধস নেমেছে, এ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এও আমরা জানি। কিন্তু ‘নির্বাচন’ শব্দটি যেভাবে আমাদের দেশে অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় রকমের ক্ষত সৃষ্টি করছে এবং তা অশুভ সংকেত। এই ক্ষত থেকে সৃষ্টি হচ্ছে আরও নানা মাত্রিক ক্ষতের, যা শুধু মানুষের অধিকারই নস্যাৎ করে দিচ্ছে না, দেশ-জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণামও ডেকে আনছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশেই দৃষ্টান্তযোগ্য নির্বাচনও হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন তো বটেই, এখন স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে এ কথাই বলা যায়, নির্বাচনের নামে আমরা শুধু অর্থনাশই করছি এবং একই সঙ্গে সামগ্রিক অমঙ্গলের দাগটা ক্রমাগত মোটা করে চলেছি। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে যে অনিয়ম, অরাজকতা ফের দেখা গেল তাতে নিরুদ্বিগ্ন থাকার অবকাশ আছে কি? এমন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পরও কমিশনের দায়িত্বশীল কারও কারোর যে প্রতিক্রিয়া সংবাদমাধমে উঠে এসেছে, তা আরও বিস্ময়কর।

অবস্থা ভালো করতে চাইলে আগে ব্যবস্থা ভালো করতে হবে- এই সত্য এড়ানো যাবে না। ব্যবস্থায় গলদ রেখে অবস্থা ভালোর প্রত্যাশা-দুরাশা বৈ কিছু নয়। সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের এক ভার্চুয়ালি গোলটেবিল আলোচনায় নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও সুপারিশ উপস্থাপিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনে ‘সার্চ কমিটি’ কেন গঠন করতে হয় কিংবা হবে? সংবিধানে তো নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের কথা লেখা আছে। একটি ভালো কিংবা আদর্শ নির্বাচন কমিশন গঠনে অবশ্যই আইন প্রয়োজন কিন্তু একই সঙ্গে এও আমলে রাখা জরুরি, শুধু একটি ভালো নির্বাচন কমিশন হলেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না, যদি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা না যায়। দলীয় সরকারের অধীনে দেশে আদর্শ নির্বাচন যে দুরূহ এই সত্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কর্মকাণ্ড দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নির্বাচনের মূল নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশন হলেও তার সহযোগী শক্তি সরকার যদি বৈরী ভূমিকা পালন করে তাহলে আদর্শ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি প্রাথমিক খসড়া তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের আরও মতামত নিয়ে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হবে। এরপর সুজনের পক্ষে তা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। সরকার যদি সংবিধানের প্রতি সম্মান না দেখায় তাহলে তা ন্যায়সংগত নয় বলেই বিবেচিত হতে বাধ্য। আমাদের জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব নেতিবাচক দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাতে এ কথা বলা যায়, একটি জাতীয় কিংবা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা যাবে না। এ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে দুটি সার্চ কমিটির পারফরম্যান্স দেখলাম। তাদের কর্মকাণ্ড সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মোটেও ছিল না। সংবিধান মানলে নির্বাচন কমিশন গঠনে অবশ্যই আইন করতে হবে এবং এই আইন হতে হবে রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে। অতীতে যে ‘সার্চ কমিটি’ করা হয়েছিল সেখানে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলনই ঘটেছে।

যতদূর মনে পড়ে ২০১১ সালে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনের একটি খসড়া তখনকার নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে আর কোনো আলোচনা পরবর্তী সময়ে শুনিনি। যদিও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আর চার মাস আছে, তবুও সরকার চাইলে এ সময়ের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন করতে পারবে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টিই মুখ্য। নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর উচ্চকণ্ঠ হওয়া জরুরি দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থেই। যদি এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন না আসে তাহলে যে রকম প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন আমরা দেখে আসছি, ভবিষ্যতেও তা-ই দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠন জনগণকে ধোকা দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া- এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেননি কিংবা করেন না। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য কম রক্ত ঝরেনি, প্রাণ উৎসর্গিত হয়নি।

প্রতিটি ক্রিয়ারই বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আমরা নাগরিক হিসেবে মতামত দেওয়ার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে পারি এবং তা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার যদি মনে করে, এসব কথা বলার অধিকার কেউ রাখেন না তাহলে দীর্ঘমেয়াদের এর কুফলই মারাত্মকভাবে দেখা দেবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো (সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তো বটেই) যদি যথাযথভাবে স্বচ্ছতার নিরিখে দায়িত্ব পালন করতে না পারে তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ভারতের নির্বাচন কমিশন যদিও গঠিত হয় আমাদের মতোই কিন্তু সেখানকার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে সেখানকার নির্বাচন কমিশন অনেক শক্তিশালী। ভারতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরই সেখানে নির্বাহী ক্ষমতার বড় অংশ থাকে প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার অধীনে। কাজেই ভারতের নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া আমাদের প্রেক্ষাপটে দৃষ্টান্ত হিসেবে যারা দাঁড় করাতে চান তা তাদের ভুল।

স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারাটা শুধু গণতন্ত্রের জন্যই অশনিসংকেত নয়, কলঙ্কেরও বটে। তাতে আমাদের সম্পর্কে ভুল বার্তা যেতে পারে বহির্বিশ্বে। আমাদের অর্জনের বিসর্জন ঘটতে পারে। সমাজের ও দেশের সচেতন নাগরিকদের পরামর্শ আমলে নিলে সরকারের যেমন ভালোই হবে, জনগণও উপকৃত হবে। ভোটারের আস্থা ফেরাতেই হবে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থা প্রশ্নমুক্ত করতে সংশ্নিষ্ট সপক্ষের দায় কমবেশি রয়েছে। কিন্তু বড় দায় নির্বাচন কমিশনের- এটি ভুলে না গেলেই মঙ্গল। যারা সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত তাদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনের কোনো বিকল্প নেই- এই বাস্তবতায় সব পক্ষকেই বসা উচিত আলোচনায়। যেহেতু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকরাসহ দেশের সচেতন নাগরিকরা প্রচলিত ধারায় নির্বাচন কমিশন গঠনের বিরোধিতা করছেন এবং যৌক্তিক কারণে ঘোর আপত্তি তুলেছেন, সেহেতু তাদের মতামতের প্রতি সরকারের সম্মান দেখানো উচিত। তাতে তাদের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হবে, তেমনি দেশ-জাতিও হবে উপকৃত। আমাদের গণতন্ত্র ফিরে পাবে ঔজ্জ্বল্য। সরকারের এও মনে রাখা দরকার, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য যদি আইন করা হয় তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পথও অনেকটাই সংকুচিত হবে। তবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সহায়ক শক্তি হিসেবে এমন সরকার প্রয়োজন যে সরকারের প্রতি পূর্ণ জনআস্থা থাকবে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঐতিহ্য কতটা দৃষ্টান্তযোগ্য, তা অতীতের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়। হূত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের দায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই; তবে সরকারের দায়ভার বেশি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা