কাজী নজরুল : ভেতরে-বাইরে

মুসা আল হাফিজ

‘সত্য মাত্রই সুন্দর’ কথাটি কাজী নজরুল ইসলামের। কাজী কবির কাছে আর্ট মানেই ছিল সত্যের প্রকাশ। কবির শিল্প ছিল সুন্দরের প্রহরী, সত্যের সেবক। যেখানেই সত্য আক্রান্ত হয়েছে, অবমাননা হয়েছে, সমাজে বা রাষ্ট্র্রে হোক, জগতপরিমণ্ডলে হোক, কাজী নজরুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

কবিতার কাছে তার প্রথম ও শেষ অঙ্গীকার ছিল সত্যের জন্য লড়াই। তার সত্যের শর্ত তৈরি হয়েছিল মানবিকতায়। মনুষ্যত্ব, সাম্য, স্বাধীনতা ছিল সেই সত্যের প্রাণ। সত্যের স্বার্থে তার দৃষ্টি উদ্ধত হয়, উলঙ্গ হয়, বাণী ক্ষুরধার এবং বীণা তরবারি হয় বলে এর বিপরীতে বস্তুগত ঐশ্বর্য পরিত্যাজ্য হয়েছিল কবির কাছে। অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস যখন পাওয়া গেছে, তখন দারিদ্র্য তার দৃষ্টিতে কোনো সমস্যাই ছিল না; বরং সত্যের শক্তিতে তিনি একে দেখেছিলেন ‘কণ্টক-মুকুট শোভা’ হিসেবে। খ্রিষ্টের সম্মান হিসেবে।

প্রয়োগবাদী বাস্তবতা আকৃষ্ট করেছিল তার সৃষ্টিকে, আর দৃষ্টিকে রহস্যভেদী করেছিল আত্মদর্শনের স্বচ্ছতা। এর সাথে যুক্ত ছিল চরিত্রের অনমনীয় দৃঢ়তা ও মানবমুক্তির প্রশ্নে শিলাসম প্রত্যয়। যুগ ও পরিবেশের হাহাকার তিনি শুনেছিলেন, শুনেছিলেন নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ের কান্না। পরাধীন ভারতের মুক্তিতৃষ্ণা ধারণ করে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক দাস্যবৃত্তি ও সর্বপ্রকার জোর জুলুমের অবসানে সত্যকে সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। তার বিদ্রোহ কোনো বিশেষ দল, মতবাদ, কিংবা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে ছিল না, তার প্রতিপক্ষ ছিল অন্যায়, অমানবিকতা, কূপমণ্ডূকতা, মানুষে মানুষে ভেদনীতি ও বর্ণবাদ। তিনি আক্রমণ করেছিলেন অসাম্যকে, যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন পরাধীনতার বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যবাদের উৎপীড়নে নিষ্পেষিত পরাধীন স্বদেশভূমি তাকে ব্যথিত বিক্ষুব্ধ করেছিল। ফলে তিনি নিপীড়িত স্বজাতির মুক্তিনেশায় আত্মদানের বিকল্প দেখেননি। জাতিকে তিনি সে লক্ষ্যে সচকিত করতে চেয়েছিলেন। ধূমকেতুতে তিনি যখন ‘ভিক্ষা দাও’ বলে কাতর মিনতি জানালেন, তখন শোনা গেল আর কিছু নয়, জাতির তাজা তরুণের প্রাণভিক্ষা চাচ্ছেন আত্মদানের জন্য, শাহাদতের জন্য।

কবির ভাষায় – ‘তোমরা চেয়ে দেখো, সর্বনাশ আমাদের বুকের ওপর চেপে বসে আছে। কোটি কোটি লোক দু’মুঠো ভাতের জন্য হা হা করে ছুটছে। ওই দেখো কোটি কোটি ভাই আধপেটা না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। তোমাদের বুকে হাত দিয়ে দেখো, সেখানে আর প্রাণ নাই, তোমাদের হৃদয়ে অনুভব করে দেখো সেখানেই আর বল নাই। ওগো, বলি চাই, একটি ছেলে বলি চাই।’

কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় জাতির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে সতর্কবাণী শুনিয়েছেন এই মর্মে যে, স্বাধীনতার জন্য কোরবানি দিতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘আজাদী মেলে না পস্তানোয়, দস্তা নয় সে সস্তা নয়।’ স্বাধীনতা পেতে হলে চাই শক্তির উদ্বোধন। স্বজাতির স্বাধীনতার জন্য সেই শক্তির সূচনা তিনি ঘটাতে চান স্বীয় সত্তায়। স্বীয় অন্তর্জগতে তিনি আজাদীর পরিমণ্ডল রচনা করেছিলেন এবং উৎপীড়ক, লুটেরা, ঔপনিবেশিক জোরবারের বিরুদ্ধে বঞ্চিত মানুষের মুক্তি আকাঙ্ক্ষায় স্বীয় সাহিত্যকে নিবেদিত করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস/যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।’

ঔপনিবেশিক লুটেরা শক্তির সাথে আপসের পথ ধরে যারা স্বাধীনতা কামনা করতেন, তাদের ‘স্বাধীনতার’ ফাঁক ও ফাঁকি কবির চোখে ধরা পড়েছিল। এরা ভীরুর প্রার্থনার মতো স্বরাজ কামনা করত, তাঁত বুনে বুনে স্বাধিকারের স্বপ্ন দেখত। কাজী কবি তার মানবিক অনুভব ও মুক্তিকামনার তীব্রতা থেকে চাবুক বর্ষণ করেছেন তাদের আত্মপরতায়। কবির ভাষায় – ‘বুকের ভিতরে ন পাই, ছ পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই/স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ তাই।’ অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি/জাগরে জোয়ান! বাত ধরে গেলো মিথ্যার তাঁত বুনি’। অতএব ভারতবর্ষে তিনি সবার আগে লিখিতভাবে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উচ্চারণ করলেন। এ দাবি জানালেন এমন সময়ে, যখন স্বাধীনতার অভিপ্রায়ে গোটা দেশ পরিণত হয়েছিল একটি কড়াইয়ে, যেখানে টগবগ করে ফুটছিল মানুষের মুক্তিস্বপ্ন। এমন কোনো প্রভাবশালী কণ্ঠ ছিল না, যা এ আকাক্সক্ষাকে কলমী ভাষা দেবে এবং এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে এর দিশানির্দেশ করবে। নজরুল কালের এই ভাষাহীন ছটফটানিকে দিলেন প্রখর প্রকাশ, সৃষ্টিসুখের উল্লাস!

শোষণমুক্ত দুঃশাসনমুক্ত সমাজ, লাঞ্ছনা, নিগ্রহ ও নিপীড়নমুক্ত জগৎ, এই ছিল নজরুলের স্বপ্নের সার। এ থেকে চুল পরিমাণও কখনো সরেননি, নড়েননি। সেই যে বিদ্রোহী কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘মহা বিদ্রোহী রণকান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভ‚মে রণিবে না’। ‘কামাল পাশা’ কবিতায় সেই বিদ্রোহী সত্তার গর্জন শোনা গেল, ‘আজাদ মানুষ বন্দি করে অধীন করে স্বাধীন দেশ/কুল মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখাল কদিন বেশ/মোদের হাতে তুর্কি নাচন নাচলে তাধিন তাধিন শেষ’। ‘রণভেরী’ কবিতায় লক্ষ করা গেল সেই বিদ্রোহীরই আফসোস। ‘তোর ভাই ম্লান চোখে চায়/মরি লজ্জায়/ওরে সব যায়/তবু কবজায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আফসোসে হায়’। এ ছিল না প্রাণশূণ্য কোনো আর্তি। তার এই বিদ্রোহী সত্তার উৎসারণে আদর্শিক যুক্তির বিশ্বস্ত প্রয়োগ ও বিশ্বাসের অন্তঃসার ছিল সুস্পষ্ট। তিনি মহা সিন্ধুর পার হতে ঘনরণভেরী শুনে যখন তারুণ্যকে আহ্বান করলেন ‘ওরে আয়’ বলে; সেই আহ্বান অকারণ ছিল না, কবি এর কারণ ব্যক্ত করলেন ‘ঐ ইসলাম ডুবে যায়’। এবং ‘যত শয়তান/সারা ময়দান/জুড়ি খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয় গান শোন গায়’। শুধু তা-ই নয়, জিন্দাদিল নকিবের মতো কবির আহ্বান ‘কর কোরবান আজ তোর জান দিল আল্লার নামে ভাই/ঐ দীন-দীন – রব আহা বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায়/শের গর্জ্জন/করি তর্জ্জন/হাঁকে ‘বর্জ্জন নয় অর্জ্জন’ আজ শির তোর মায় চায়’। যেহেতু কবির রক্তে ছিল শহীদের লোহু, দিলিরের খুন, যেহেতু ‘আমি বুকে বরণকারী, ও হাসিমুখে মৃত্যুকে গ্রহণকারী’ জাতির প্রতিনিধি হিসেবে কবির রক্তে ‘খুন জোশি’ বীরের উল্লাস ছিল, অতএব স্বাধীনতার জন্যে রক্তফোরাত বইয়ে দিতে যারা ভীত ছিল, যারা কোরবানির ‘খুনের খুঁটিতে কল্যাণ কেতু’ কীভাবে উড়ে তা না বুঝে অকারণ হল্লা করত, তাদের লক্ষ্য করে সাবধানবাণী উচ্চারণ করার জন্য সারা ভারতে তিনিই ছিলেন যোগ্যতর কবি। কবি সেটি করেছেন দুঃসাহসে। কোরবানি কবিতায় তিনি লিখেছেন ‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদবোধন/দুর্ব্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামোখা ক্ষুব্ধ মন’। তার এই তীব্র তিরস্কার তাদের জন্য, যারা কোরবানিতে দেখে রক্তপাত ও মৃত্যু, জীবনকে দেখে না।

এই দুঃসাহসের তিক্ত ফল কবিকে ভোগ করতে হয়েছে জীবদ্দশায়, এবং মৃত্যুর পরও রয়ে গেছে তার রেশ। কবির সাহিত্যকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে এবং কবিকে বলা হয়েছে – তিনি আবেগের তোড়ে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছছেন। বলা হয়েছে, তিনি উত্তেজনার অপরিণামদর্শী কাব্যকার, যার কবিতায় সত্যিকার কোনো চিন্তাশীলতা বিকশিত হয়নি। সমালোচনার এসব তীর প্রবল গতিতে কবির দিকে নিক্ষিপ্ত হলেও তার কবিতাই লৌহ বর্ম হয়ে সব আক্রমণ প্রতিহত করেছে ও করে চলছে। জীবদ্দশায় কবি নিজেই জবাব দিয়েছেন এর। এবং দুঃখ করে লিখেছিলেন ‘গালির গালিচায় বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া রোগ, এ স্বদেশপ্রেমের বাই উঠল?’

আসলে আলোক যখন জ্বলে, যখন নক্ষত্র চোখ ধাঁধিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার স্বরূপ উদঘাটন করা অনেকের পক্ষেই সহজ হয় না। এই বাস্তবতার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষিত বহু বাঙালির চিত্তের দীনতা অনেকটা ক্রিয়াশীল ছিল কাজী নজরুলের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে। ধার্মিক অনেকেই কাজী কবির উচ্ছল উল্লাসে সহসা হতভম্ব হয়ে গেলেন আর তার বাঁধভাঙা উচ্চারণের মধ্যে দেখলেন কুফরির আলেয়া। যেহেতু তিনি খোদার আসন আরশ ছেঁদিয়া আত্মউদ্ভাসের কথা বলেন! কিন্তু এর চেয়েও বড় আপত্তি দাঁড়াল, তিনি দেব-দেবী নিয়ে কাব্য করেছেন। ফলে কাজীর মধ্যে কুফরির আলেয়া দেখার চেষ্টা এখনো বিদ্যমান। কিন্তু কাজীর জীবন বহু নদীতে সাঁতার কেটে শেষাবধি তাওহিদে এমন নিমজ্জন লাভ করে, যার মধ্যে নিশ্চিত হয় জীবনের উপসংহার। শুরুতে মুসলিম ঐতিহ্যে শিক্ষা ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত হলেও এক সময় আত্মদ্বন্দ্বে বিক্ষত হতে থাকেন কবি। ১৯২০-এর দশকে প্রায়ই নিজেকে নাস্তিক ভাবতেন। ১৯৩০-এর দশকে চন্দ্রবিন্দুতে তাকে দেখা গেল ধর্মে নিবেদিত, কিন্তু অস্থির। এক দিকে কালী দেবীর প্রতি নিবেদিত শ্যামাসঙ্গীত, গ্রামোফোন কোম্পানিতে হিন্দুবিশ্বাসের অনুবর্তী বহু গান, অপরদিকে ‘বক্ষে আমার কাবার ছবি, চক্ষে মোহাম্মদ রাসূল’! হ্যাঁ, তখন মাত্র চার বছর বয়সে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে কবির দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল মারা গেছেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে কবি দুর্বল হতে শুরু করেন। হয়ে পড়েন একদম বিমর্ষ, বিহ্বল। এ বিমর্ষতা তার সাথে থেকেছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া অবধি। ব্যথিত, অশান্ত কবি শান্তির জন্য দীক্ষা নিয়েছিলেন হিন্দু যোগী বরদাচরণ মজুমদারের কাছে। এর প্রভাব গানে গানে কথা বলেছে। এর মধ্যে স্ত্রী প্রমীলা দেবী অসুস্থ, আরো অসুস্থ হলেন, আক্রান্ত হলেন পক্ষাঘাতে।

১৯৩৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে কবির অস্থিরতা চরমে। তার গুরু বরদাচরণকে লিখিত তখনকার চিঠিতে অসহায়ত্বের আওয়াজ ‘আপনি শিব, আপনার ঔষধের ওপর আর কিছু করা উচিত ছিল না।… যদি তাহার (প্রমীলার) জীবনের কোনো প্রয়োজন থাকে, আপনারই আশীর্বাদে সে বাঁচিয়া উঠিবে। স্বয়ং শিব (বরদাচরণ) যদি বাঁচাইতে না পারেন কেহ পারিবে না।’ সব চিকিৎসা চলল, কিন্তু প্রমীলা সুস্থ হননি আদৌ এবং বরদাচরণ মারা যান ১৯৪০ সালের ১৪ নভেম্বর।

এরপর কেবল বদলে যাওয়ার গল্প। নভেম্বরে বরদাচরণ মৃত্যুবরণ করে কবির ভেতর জাগিয়ে দিলেন তার নবজন্মকে। আপন বন্ধু শান্তিপদ সিংহকে বলেন, বরদাচরণের নয়, নামাজের আশ্রয় নেয়া উচিত ছিল তার। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি ঢাকায় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, সলিমুল্লাহ হলে, ফজলুল হক হলে। নজরুল জীবনীকার গোলাম মুরশিদ লিখেন, এর কোনো একটা জায়গায় জসীমউদ্দীনের সাথে তার দেখা হয়। জসীমউদ্দীন এ ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, ‘এক জায়গায় কবি বলিয়া ফেলিলেন, আমি আল্লাহকে দেখিয়াছি। কিন্তু সে কথা বলবার সময় এখনো আসে নাই। সেসব বলবার অনুমতি যেদিন পাব, সেদিন আবার আপনাদের সামনে আসব।’

এর দু-তিন দিনের মধ্যেই ২১ ডিসেম্বর তিনি মুসলিম ছাত্র সম্মিলনের কর্মকর্তাদের লেখেন, ‘আমার মন্ত্র, ইয়া কা নাবুদু ওয়া ইয়া কা নাস্তাইন। কেবল এক আল্লাহর আমি দাস, অন্য কারুর দাসত্ব স্বীকার করি না, একমাত্র তাঁরই কাছে শক্তি ভিক্ষা করি। আমি ফকির – আল্লাহর দরবারে আজ আমি পরম ভিক্ষু, যদি তাঁর কাছে রহমত ও শক্তি ভিক্ষা পাই – ইনশা আল্লাহ, শুধু ভারত কেন, সারা দুনিয়ায় সত্যের ডঙ্কা বেজে উঠবে তৌহিদের, পরম অদ্বৈতবাদের অমৃতবন্যা বয়ে যাবে।… সর্বশক্তিদাতা আল্লাহর কাছে মুনাজাত করুন যেন আমার প্রতীক্ষার অন্ধকার রাত্রি নবযুগের সুবহ-সাদেকের অরুণালোকে আশু রঞ্জিত হয়ে ওঠে। ১৯৪২ সালের ২ জুন প্রকাশিত তার সর্বশেষ গদ্য রচনায় তিনি নিজের ভ্রান্তি এবং তার প্রতি দৈব ইঙ্গিত সম্পর্কে স্বীকারোক্তি করেছেন : ‘…কোথা হতে একজন সাথী এসে বললেন, ধ্যান করো, দেখতে পাবে।…আমি আমার প্রলয়সুন্দরকে প্রাণপণে ডাকতে লাগলাম, পথ দেখাও, তোমার পথ দেখাও। কে যেন স্বপ্নে এসে বলল, কোরআন পড়ো।’

১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত মাঘ সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদীতে ‘আর কত দিন?’ কবিতায় তিনি কল্পনা করেছেন, স্বর্গীয় আশীর্বাদ সমাগত : ‘আসিবে এবার আমার পরম বন্ধুর বোররাক/ওই শোনো পুব-তোরণে কাহার রঙিন নীরব ডাক!’ এরপর আর তার কবিতায় দেব-দেবীর বন্দনা নেই এবং বৃষ্টিধারার মতো ইসলামী বিশ্বাসের উচ্ছ্বাসে প্লাবমান তার পরবর্তী কাব্য-গান। নজরুলের এই প্রত্যাবর্তনের প্রবল লড়াই তাকে একাই লড়তে হয়েছে। তার আত্মমন্থন ও আত্মউন্মোচনকে বুঝতে ভুল করেছে ধর্মধ্বজ অনেকেই।

কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে খুঁজে পেতে সক্ষম ছিলেন, আপনকে চিনতে পেরেছিলেন এবং আত্মপরিচয়ের পথ ধরে সত্যকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। সেই সত্যে ছিল মধ্যাহ্ন সূর্যের উত্তাপ, সেই সত্য ছিল মাটির মতো শীতল, নদীর মতো গীতল, সেই সত্য সাহিত্যকে অভিজাত শ্রেণীর কয়েদখানা থেকে মুক্ত করে গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার বানিয়ে দিলো!

কাজী কবির সত্য অধরা ছিল না, লীলাময়ী ছিল না, এই সত্যে ছিল তার সমগ্র সত্তা তনুমন প্রাণ উৎসর্গিত এবং তা বিজড়িত ছিল তার গোটা অস্তিত্বে। অস্তিত্ব দর্শন কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়েছিল বিশালতা, যে বিশালতার প্রেক্ষাপটে তিনি যথার্থই বলেছিলেন, ‘আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া/ভয়ে সমস্ত নরক, হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া’। কাজী কবির এই অস্তিত্ববাদ আত্মগর্বীর আস্ফালন ছিল না, ছিল তাওহিদে সমর্পিত কবির সুগভীর দার্শনিক বোধের অভিপ্রকাশ, সূর্যবোধ তার নিজের সত্তায় স্রষ্টার সত্যকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় লিখেছেন ‘স্রষ্টারে খোঁজো – আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে/ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোল দেখ দর্পণে নিজ কায়া/দেখিবে তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাহার ছায়া’।

কেবল কাব্যে নয়, সঙ্গীতেও আছে একই দার্শনিক ভাবের দ্যোতনা, ‘অন্তরে তুমি আছো চির দিন/ওগো অন্তর্যামী!/বাইরে বৃথাই যত খুঁজি তাই/পাইনা তোমারে আমি’। অন্তরের এই সত্যানুভূতি তার সত্তায় গভীর এক আস্থার মোহনা তৈরি করেছিল। যেখানে সত্যের আলোয় স্নাত, পুলকিত ও প্রশান্ত কবি বলেন, ‘আল্লা পরম প্রিয়তম মোর, আল্লা ত দূরে নয়/নিত্য আমারে জড়াইয়া থাকে, পরম সে প্রেমময়’। অতঃপর কাজী নজরুলের কবিতায় আমরা শুধু বিদ্রোহ পাচ্ছি না, শুধু সাম্যের আকুলতা দেখছি না, যুদ্ধের নাকাড়াধ্বনিই শুনছি না, শুনছি গভীর থেকে গভীরতর এক বিশ্বাসের লহরী, শুনছি আত্মশক্তির চূড়াস্পর্শী বিজয়গাঁথা। তার প্রেম, তার সংগ্রাম, তার আত্মদহন, আত্মখনন, সবকিছুর মর্মমূলে আত্মবোধের প্রাণসম্পদ রয়েছে, যা জর্জ বার্কলি প্রবর্তিত ভাববাদ, কিংবা নিৎশের অতিমানব চেতনা থেকে পৃথক। এ হচ্ছে কাজী কবির স্বয়ং প্রকাশ মৌলিকত্ব; সসীমের মাঝে অসীমের উপলব্ধি, প্রলয়ের সাথে সৃষ্টির অভিপ্রকাশ, ব্যষ্টির ভেতরে সমষ্টির সত্তানুভূতি, যা সেই মৌলিকত্বের বৈচিত্র্যময় নক্ষত্রালোক মাত্র।

কবির সত্তায় জীবনবোধের স্বচ্ছ এক দর্পণ ছিল, সদুত্তর ছিল জীবনজিজ্ঞাসার। ফলত তার সত্য নিখিল আত্মার সমান্তরাল হতে পেরেছে। এ কথাই আমরা শুনতে পাই কবির উচ্চারণে, ‘আমি জানি, আমার কণ্ঠের ঐ প্রলয় হুঙ্কার/একা আমার নয়, সে যে নিখিল আত্মার যন্ত্রণা চিৎকার’।

লেখক: কবি, গবেষক।