বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে কেন এই মিথ্যাচার?

রুমিন ফারহানা

দেশের ১৭ কোটি মানুষের চোখ এখন এভার কেয়ার হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি আছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। চিকিৎসকদের মতে, তার লিভার, কিডনি, হার্ট, ফুসফুসে সমস্যা আছে। সমস্যা আছে ডায়াবেটিসের, রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে নেই। বায়োপসিও করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ভালো নেই তিনি। গত তিন বছর যাবৎ তিনি আছেন সরকারের হেফাজতে। সুতরাং তার আজকের শারীরিক অবস্থার জবাব সরকারকেই দিতে হবে।

নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং তার প্রতি সরকারের অমানবিক, নির্মম আচরণ। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, কোনও নির্বাচনে একটি আসনেও যিনি কখনও পরাজিত হননি, দেশের সর্ববৃহৎ এবং জনপ্রিয়তম দল বিএনপি’র চেয়ারপারসনের ওপরে সরকারের অন্যায় আচরণ দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। মানুষ স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে, একটা মানুষের একেবারে মৌলিক অধিকার তার পছন্দমতো জায়গায়, পছন্দমতো চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

আমার ক্ষমতার গণ্ডি সীমিত। এই সীমিত গণ্ডিতেও নানা ফোরামে আমি তার চিকিৎসা পাবার অধিকারের পক্ষে কথা বলেছি, লিখেছি, লিখছি। আইনগত ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছি। এই দফায় সংসদ অধিবেশন শুরু হবার পর ১৬ নভেম্বর আমি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদন দিতে সংসদে সরকারের কাছে প্রস্তাব তুলি। সেখানে আমি বলি, এই ধারায় সরকারকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বেগম জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার আছে সরকারের।

আমার বক্তব্যের পর নিজের অবস্থান জানাতে গিয়ে আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন– ‘কখনও বলিনি ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই’। ওনার এই বক্তব্যটি দিয়ে শিরোনাম করেছে বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক। তিনি নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিনা পয়সায় বিএনপিকে আইনি পরামর্শ দেবার কথা বলে সংসদে জানান, ‘খালেদা জিয়া আবার জেলে গিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার আবেদন করলে তা বিবেচনা করা হবে। এখন যে অবস্থায় আছেন, তাতে আবেদন নতুন করে বিবেচনার কোনও সুযোগ নেই। এই আবেদন ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। নিষ্পত্তিকৃত দরখাস্তের ওপর আর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না’। তার এই বক্তব্যটি তিনি সংসদে যে প্রথম দিয়েছেন তা না, এর আগে যখনই তার বিদেশে চিকিৎসার কথা এসেছে তখনই তিনি এই কথা বলেছেন, যার রেকর্ড এই দেশের অসংখ্য মিডিয়ায় আছে। এখনও যে কেউ চাইলে ইউটিউবে তার এই বক্তব্যটি শুনে নিতে পারেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় সরকারকে এক অকল্পনীয় পরিমাণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনও রকম যুক্তি-তর্কের অবকাশ নেই। সরকারের এই ক্ষমতা এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের তুলনায় অনেক বেশি। কোনও মামলা নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতকে ব্যাখ্যা দিতে হয় কোন যুক্তিতে তারা এই রায় দিয়েছেন। সেই ব্যাখ্যা পছন্দ না হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিলও করতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকারকে কোনও রকম শুনানিতে যেতে হয় না, এমনকি কোনও পদক্ষেপ তারা কেন নিয়েছেন কিংবা নেননি সেটারও ব্যাখ্যা দিতে হয় না।

এই ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ কোনও পক্ষ থাকে না এবং আপিলেরও কোনও প্রশ্ন নেই। দু’দকের মামলা হোক কিংবা অন্য কোনও ফৌজদারি মামলা, ৪০১-এর ক্ষমতা তাতে এতটুকু বাধাগ্রস্ত হয় না।

এই ধারায় সরকার যে কারও সাজা স্থগিত করতে পারে, মওকুফ করতে পারে। সেটার জন্য শর্ত দিতে পারে কিংবা স্বার্থ ছাড়া করতে পারে। প্রয়োজন মতো নতুন করে শর্ত যুক্ত করতে পারে কিংবা আগে দেওয়া কোনও শর্ত প্রত্যাহারও করতে পারে। এসব করার জন্য কাউকে নতুন করে জেলে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা কোনোভাবেই আইনে বলা নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও কিন্তু সেটা ঘটেছে।

এই ধারায় প্রথম যখন ছয় মাসের জন্য তার সাজা স্থগিত করে তাকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তখন শর্তের মধ্যে ছিল তিনি বাসায় চিকিৎসা নেবেন। এরপর মেয়াদ শেষে তার মুক্তির মেয়াদ দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি পরবর্তীতে প্রাথমিক শর্ত বাতিল করে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তাকে নতুন আবেদন করতে হয়েছে, কিন্তু নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে তাকে জেলে যেতে হয়নি। তাহলে এখন জেলে যাবার শর্ত কেন আসছে?

একটা সরকার কতটা অমানবিক হলে অত্যন্ত গুরুতর অসুস্থ সিসিইউতে থাকা একজন মানুষকে জেলে গিয়ে পুনরায় আবেদন করতে বলে! এবং সরকার এমন কথা বলছে যেটা আইনে নেই।

বিষয়টি এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, বিষয়টি গড়াল আরও খানিক দূর। আমার দাবির জবাবে দেওয়া বক্তব্যের দুদিন পর ১৮ নভেম্বর বিএনপি দলীয় এমপি জিএম সিরাজ বক্তব্য দেন। তার জবাবে আইনমন্ত্রী যা বলেন, তাতে আমি যেমন হতবাক হয়েছি, তেমনি হতবাক হয়েছেন যারা তার আগের বক্তব্য পড়েছেন বা শুনেছেন তারাও । এবার তিনি বলছেন বিদ্যমান আইনে বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দেবার নাকি কোনও কোনও সুযোগই নেই। তিনি বলেন –

‘আমি তো দেখিয়েছি যে বাংলাদেশের আইনের বইয়ে এটা নাই। ওনারা যদি এটা দেখাতে পারেন, তাহলে তো আমরা এটা বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু এটা আইনের বইয়ে নাই। ওনারাও দেখাতে পারবেন না, বিবেচনার প্রশ্ন আসে না… ওনারা আমাকে যত খুশি গালি দিতে পারেন। তাতে আমার কিছু আসে-যায় না। আমি আইন মোতাবেক চলবো।’’

বেগম জিয়া বিদেশে চিকিৎসা নিতে পারবেন ৪০১ ধারার অধীনে এটা আইনের বইয়ে আছে– এটা আইনমন্ত্রী শুধু সংসদে না, বলেছেন বহু জায়গায়। আজ হঠাৎ করে তিনি কীভাবে এই কথা বলছেন? বলছেন কারণ কোনোভাবেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বেগম জিয়াকে বিদেশে যেতে দেবে না সরকার।

আজকে যদি দেশে আইনের শাসন থাকতো, থাকতো ন্যায়বিচার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তাহলে তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বহু আগেই জামিনে মুক্ত হতেন। যে দেশে রুটিন চেকআপের জন্য রাষ্ট্রপতি নিয়মিত ইংল্যান্ড-জার্মানি ঘুরে আসেন, যে দেশের সাধারণ মানুষ ঘটিবাটি বিক্রি করে হলেও পাশের দেশ ভারতে চিকিৎসার জন্য যেতে বাধ্য হয়, সে দেশের চিকিৎসার হাল নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই।

সরকার খুব ভালো জানে ৪০১ ধারায় তার ক্ষমতা কতটা অপরিসীম। এই ক্ষমতা সরকার ব্যবহার করবে না, সেটা পরিষ্কার বলে দিলেই হতো। আদালতের মতো সেটার কারণ ব্যাখ্যা করারও কোনও দায় নেই। ‘আইনে নেই’ এই মিথ্যাচারের কোনও প্রয়োজন ছিল না।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

আরো