বাংলাদেশের আইনে সিগারেট এখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য!

ধূমপান ও তামাকের ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি এমনিতেই উদ্বেগের কারণ। কভিড-১৯-এর সংক্রমণের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউন চলাকালে বেশকিছু দেশে সাময়িকভাবে সিগারেট উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ ছিল। তবে বাংলাদেশে ১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কারণে কভিডের মধ্যেও নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পেরেছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলো। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলে (এফসিটিসি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে এখনো সিগারেটকে বিবেচনা করার বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি করা হয়েছিল জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, পরিবহনসহ বাজারে এগুলোর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য। এ আইনের ধারাবলে সরকার প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো বা কমানোসহ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে। আইনে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, চিকিৎসার কাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম যেমন রয়েছে, তেমনি সিগারেটের মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যও এ তালিকায় রয়েছে।

অর্ধশতাব্দীরও পুরনো আইনে সিগারেটকে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি সামনে আসে গত বছরের এপ্রিলে। কভিডের কারণে তখন দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি চলছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন, বিতরণ ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও সে সময় বন্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ২ এপ্রিল ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে জেলা প্রশাসক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোম্পানির উৎপাদন, তামাক ক্রয়, প্রস্তুত করা পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রমে সহায়তা করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারির অনুরোধ করা হয়। এর দুদিন পরই একই ধরনের দাবি জানিয়ে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের (জেটিআই) মালিকানাধীন ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের (ইউডিটিসিএল) পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। বিএটিবিসি ও ইউডিটিসিএলের চিঠিতে ১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সিগারেটকে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এর উৎপাদন চালু রাখতে মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়। বহুজাতিক দুই সিগারেট উৎপাদক কোম্পানির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে কভিড-১৯-এর কারণে ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেও এ দুই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করতে বলা হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৮ মে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের (এনটিসিসি) পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বিএটিবিসি ও ইউডিটিসিএলকে দেয়া বিশেষ অনুমতি প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হয় শিল্প মন্ত্রণালয়কে। পাশাপাশি কভিড-১৯-এর সময়ে তামাক উৎপাদন ও বিক্রিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়। অবশ্য এর দুদিন পরেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও তাদের পাঠানো চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেয়।

প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা থেকে সিগারেটকে বাদ দিতে জাতীয় সংসদে একটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করেছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি। গত বছরের নভেম্বরে এক ওয়েবিনারে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান আমলে সিমেন্ট, সার ও শিশুখাদ্যের সঙ্গে ১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আইনে সিগারেটকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এটি এখনো পরিবর্তন করা হয়নি। এ আইনের সুবিধা নিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো কভিড-১৯-এর কারণে আরোপ করা সাধারণ ছুটির মধ্যেও সব ধরনের সুবিধা নিয়েছে। এমনকি তারা প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধাও নিয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য। এজন্য সিগারেটকে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দিতে সংসদে একটি বেসরকারি বিল জমা দিয়েছি।

তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতি বছর বিশ্বে ৮০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ তামাক ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট রোগে মারা যায় বলে জানিয়েছে তামাকবিরোধী বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭তম। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালে হস্তক্ষেপ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮, যা গত বছর ছিল ৭৭। বিশ্বের ৫৭টি দেশে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩-এর আলোকে একটি নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়াজনীয়তা তুলে ধরতে প্রজ্ঞা এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছরের এপ্রিলে সাধারণ ছুটির মধ্যেও যখন সিগারেট কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হয় তখনই আমরা এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। সে সময় তামাকবিরোধী ২০টি সংগঠনের পক্ষ থেকে কভিডকালে সিগারেট বিক্রি বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছিল। এমনকি ১০০ জন বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষ থেকেও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে কভিডের সময়ে সিগারেট নিষিদ্ধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়া হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাকবিরোধী উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতার পাশাপাশি দেশকে তামাকমুক্ত করতে সরকারের দৃঢ় সংকল্পের বিপরীতে এখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় সিগারেটের অন্তর্ভুক্ত থাকা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাকবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এক্ষেত্রে ৫০ বছরের পুরনো আইনের ধারা অনুসারে এখনো সিগারেটকে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি সরকারের এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটি স্পষ্ট করার অবকাশ রয়েছে বলে আমি মনে করি।

বহুজাতিক সিগারেট উৎপাদকদের ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) ব্যবসা সম্প্রসারণকে বর্তমান যুগের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, আফ্রিকায় ব্যবসা বাড়াতে কোম্পানিটি প্রায় যেকোনো কিছুই করতে প্রস্তুত আছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় সিগারেটের ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণে ফিলিপ মরিস ও বিএটির মতো বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আফ্রিকার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সেখানে অনেকটাই একচেটিয়া ব্যবসা করছে কোম্পানিগুলো। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টপ নামক তামাকবিরোধী এক বৈশ্বিক সংগঠনের গবেষকেরা ফাঁস হওয়া হাজার হাজার নথি বিশ্লেষণ করে বিএটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছেন। ২০০৮-১৩ পর্যন্ত কঙ্গো, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, সুদানসহ ১০টি আফ্রিকান দেশে বিএটি ২৩০টির বেশি প্রশ্নবিদ্ধ লেনদেন করেছে। তথ্যপ্রমাণ ইঙ্গিত করছে যে কোম্পানিটি আফ্রিকার রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নগদ অর্থ, গাড়ি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনুদান এমনকি বিমানের টিকিটও দিয়েছে। আফ্রিকায় বিএটির এসব অনিয়ম সম্পর্কে যুক্তরাজ্য সরকার অবগত থাকলে তারা দেখেও না দেখার ভান করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম, বিবিসি ও বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে বিএটি জিম্বাবুয়ের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকে ২০১৩ সালে কোম্পানির পক্ষ হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক থাকা বেশকিছু ব্যক্তির মুক্তির জন্য ৩ থেকে ৫ লাখ ডলার ঘুস সেধেছিল।

বাংলাদেশে সিগারেটের বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিএটিবিসি। জেটিআইয়ের মালিকানাধীন ইউডিটিসিএল রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

বিএটিবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেহজাদ মুনিম বলেন, ধূমপায়ীদের কাছে সিগারেট প্রয়োজনীয় পণ্য। এ কারণেই আইনে এটিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। করোনার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় সাময়িকভাবে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করে কোনো সুফল আসেনি। বরং সেখানে সিগারেটের ব্যবহার আরো বেড়েছে। বিএটির বিষয়ে আফ্রিকার ব্যবসা নিয়ে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোর তদন্ত করে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রাজস্ব আহরণের কথা চিন্তা করে সরকারের কাছ থেকে সিগারেট কোম্পানিগুলো বেশি সুবিধা পাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বের আর কোনো দেশে এমন কোম্পানি নেই যারা সে দেশের মোট রাজস্বের ১০ শতাংশ প্রদান করে। প্রতি বছরই সরকার সিগারেটের ওপর কর বাড়াচ্ছে। যেসব দেশে সিগারেটের ওপর করপোরেট করহার বেশি তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এসব বিষয় বিবেচনা করলে তো বলতে হয় সরকার আমাদের বেশি সুবিধা দেয়া তো দূরের কথা, বরং আমাদের ক্ষেত্রে বেশ শক্ত অবস্থানেই রয়েছে। বণিক বার্তা

আরো