দেশে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে বিদেশি কোম্পানি

বাংলাদেশে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ পেতে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যেকোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের রেলপথ ও রেল অবকাঠামো ব্যবহার করে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারবে তারা। বিদেশি কোম্পানি তাদের রোলিংস্টক চালাতে পারবে বাংলাদেশের রেলপথে। আংশিক বা পুরোপুরিভাবে করতে পারবে ‘ক্রস বর্ডার’ ও ‘ক্রস কান্ট্রি’ অপারেশন। বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য এমন সুযোগ রেখে ১৮৯০ সালের রেলপথ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

রেলপথ আইন হালনাগাদ ও যুগোপযোগী করার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দাখিল করা রেলপথ আইন (সংশোধিত) ২০২১-এর খসড়ার ১৫৪ ধারায় বিদেশি কোম্পানিকে বাংলাদেশে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিবদ্ধ হতে হবে।

দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানিকে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ দিতে রেলপথ আইনে সংশোধনীর এ উদ্যোগ নতুন হলেও দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ট্রেন পরিচালনা রেলওয়ের জন্য নতুন নয়। বর্তমানে বেশ কয়েকটি ট্রেন ইজারাদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ইজারার চুক্তি অনুযায়ী ট্র্যাক, সিগন্যাল, স্টেশন, কোচ, ইঞ্জিন, জ্বালানি, লোকোমাস্টার, পরিচালক, স্টাফ—সবই রেলওয়ের। ইজারাদারের দায়িত্ব শুধু ভাড়া আদায় করা। আইনের সংশোধনী পাস হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন পরিচালনায় দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করতে পারবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলপথ আইন ২০২১-এর খসড়ার ১৫৪ ধারায় সংযুক্ত করা হয়েছে এ ধারা। এতে বলা হয়েছে, সরকারের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে। বাংলাদেশের এ প্রাইভেট কোম্পানি আবার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশি বা বিদেশি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি করতে পারবে।

একই ধারায় আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে প্রাইভেট কোম্পানিকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ক্রস বর্ডার অপারেশনসহ তার নেটওয়ার্কের আংশিক বা সম্পূর্ণ অংশে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিতে পারবে। একইভাবে চুক্তি অনুযায়ী, যাত্রী বা পণ্য বা উভয় পরিবহনের উদ্দেশ্যে প্রাইভেট কোম্পানিকে তার রোলিংস্টক পরিচালনার জন্য রেলওয়ের ট্র্যাক, সিগন্যাল ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

আরো বলা হয়েছে, প্রাইভেট কোম্পানিকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে চুক্তির শর্তানুসারে এক দেশ থেকে আরেক দেশে (ক্রস কান্ট্রি অপারেশন) পরিচালনার উদ্দেশ্যে সেই কোম্পানির রোলিংস্টক ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

খসড়া আইনের ১৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রাইভেট কোম্পানির নিরাপত্তার জন্য গৃহীত ব্যবস্থার অতিরিক্ত, সেফটি কমিশনার বা তার পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী কোনো কর্মকর্তা থাকবেন। তিনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যেরূপ উপযুক্ত মনে করবেন, সেরূপ সাধারণ বা বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারবেন। প্রাইভেট কোম্পানি তা মানতে বাধ্য থাকবে। আরো বলা হয়েছে, প্রাইভেট কোম্পানি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সময় কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের ভৌত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জন্য তারাই দায়ী থাকবে।

ট্রেন পরিচালনায় দেশি-বিদেশি কোম্পানি নিযুক্ত করার পাশাপাশি খসড়া আইনে আরো বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। আইনটির খসড়ার ওপর বিভিন্ন মতামত দিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নদী রক্ষা কমিশন মতামতে বলেছে, সমন্বিত হাইড্রোমরফোলজিক্যাল সমীক্ষা করে নৌ-চলাচলের জন্য পানির উচ্চতাকে সুবিবেচনায় নিয়ে সেতু নির্মাণ করতে হবে। কোনোক্রমেই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ও স্বল্প উচ্চতার সেতু নির্মাণ করা যাবে না। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সুষ্ঠু নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথের ওপর সেতু/ব্রিজ/কালভার্ট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে উল্লম্ব ছাড় ও আনুভূমিক ছাড় রাখার বিষয়ে বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।

অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে জানিয়েছে, নদী, ঝরনা বা অন্য কোনো পানিপ্রবাহের ক্ষেত্রে স্থায়ী পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে এসবের স্বাভাবিক প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেটি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। নতুন রেললাইন নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কৃষিজমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল অধিগ্রহণের বিষয়টি পরিহার করা যেতে পারে। আবার যেহেতু বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ দিন দিন কমছে, সেহেতু নদী, ঝরনা বা অন্য কোনো পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা সমীচীন।

ব্রিটিশ আমলের রেলপথ আইনটি সংশোধনের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, আইনের খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এখনো পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। কিছু বিষয় আরো যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন। চূড়ান্ত করার আগে আইনটির খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আরো একাধিক সভার প্রয়োজন হতে পারে। আমরা আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো এগিয়ে নিচ্ছি।