ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা কমছে, বাড়ছে ১৫টিতে

পরিচালন সক্ষমতা ও চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী আসন পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি শিক্ষার্থী আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ বিষয়ে সুপারিশ এনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ডিনস কমিটি। ওই প্রতিবেদনে ৪৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থী আসন কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আর আসন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে ১৫টিতে। বাকি ২৬ বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকছে। ডিনস কমিটির সুপারিশ আমলে নেয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ১ হাজার ১৫টি আসন কমবে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনর্নির্ধারিত আসনের আলোকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট খোলায় গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা অনেক বেড়েছে। যদিও সে অনুপাতে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে পুরনো বিভাগগুলোর শিক্ষার্থী আসন সংখ্যার যৌক্তিকীকরণও সময়ের দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, শিক্ষার্থী আসন বাড়ানো বা কমানোর বিষয়টি মুখ্য নয়; বরং এর যৌক্তিকীকরণ হচ্ছে। কারণ যেসব বিভাগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাহিদা রয়েছে, সেগুলোয় আসন বাড়ানোর সুপারিশ এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও গবেষণার জন্য একটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে যে-সংখ্যক শিক্ষক ও যে পরিমাণ অবকাঠামো প্রয়োজন, সেটি রয়েছে কিনা তাও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের মান বৃদ্ধি সর্বোপরি দক্ষ গ্র্যাজুয়েট গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

জানা যায়, আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভাগগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে অনুষদ ও ইনস্টিটিউটগুলোর পক্ষ থেকে ডিনস কমিটির কাছে শিক্ষার্থী আসনের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। তাদের পরামর্শ ও সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি ডিনস কমিটির এক সভায় শিক্ষার্থী আসন পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ আনা হয়। পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে ডিনস কমিটির সুপারিশ জেনারেল অ্যাডমিশন কমিটি, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপন করা হবে।

ডিনস কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থী আসন সবচেয়ে বেশি কমানোর সুপারিশ আনা হয়েছে কলা অনুষদের বিভাগগুলোর ক্ষেত্রে। বর্তমানে অনুষদটির ১৭টি বিভাগে শিক্ষার্থী আসন রয়েছে ১ হাজার ৮৭৫টি। ডিনস কমিটির প্রতিবেদনে কলার ১৭টি বিভাগের ১৬টিতেই শিক্ষার্থী আসন কমানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলায় ১৩২ থেকে ১২০, ইংরেজিতে ১৫০ থেকে ১২০, আরবিতে ১৫০ থেকে ১০০, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে ১০০ থেকে ৭৫, উর্দুতে ১১০ থেকে ৭০, পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজে ৯০ থেকে ৫০, ইতিহাসে ১৩০ থেকে ১১০, দর্শনে ১৭০ থেকে ১২০, ইসলামিক স্টাডিজে ১৮৫ থেকে ১০০, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ১৬০ থেকে ১১০, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় ৭৫ থেকে ৬৫, ভাষাবিজ্ঞানে ৯০ থেকে ৭০, সংগীতে ৮০ থেকে ৬০, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ১০০ থেকে ৬০ ও নৃত্যকলা বিভাগে শিক্ষার্থী আসন ৩৫ থেকে কমিয়ে ৩০টি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাকি থাকা বিভাগ থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজে আসন সংখ্যা ১৮ থেকে বাড়িয়ে ২৫ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ডিনস কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে কলা অনুষদে আসন সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ১ হাজার ৩৬০।

আসন সংখ্যায় বড় পরিবর্তন আসছে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের বিভাগগুলোতেও। অনুষদটির নয়টি বিভাগের মধ্যে আটটিতেই আসন সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করেছে ডিনস কমিটি। এর মধ্যে ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স—এ চারটি বিভাগের প্রতিটিতেই আসন সংখ্যা ১৮০ থেকে কমিয়ে ১৫০ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ও ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট—এ তিন বিভাগের প্রতিটিতে ১১৫ থেকে কমিয়ে ১০০ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের আসন ১৫০ থেকে কমিয়ে ১০০ করার সুপারিশ এসেছে। অন্যদিকে বাকি থাকা অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগে ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হচ্ছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে বর্তমানে আসন রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি। ডিনস কমিটির সুপারিশ আমলে নেয়া হলে তা কমে দাঁড়াবে ১ হাজার ৫০।

শিক্ষার্থী আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বড় পরিবর্তন আসছে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতেও। অনুষদটির ১৬টি বিভাগের মধ্যে ১০টিতে আসন কমানো, তিনটিতে বাড়ানো ও বাকি তিনটিতে অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করেছে ডিনস কমিটি। আসন কমানোর সুপারিশ করা বিভাগগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ২০০ থেকে ১৫০, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ১০০ থেকে ৮০, সমাজবিজ্ঞানে ১৮৫ থেকে ১৫০, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় ৬৬ থেকে ৬০, লোকপ্রশাসনে ১১০ থেকে ৯০, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নে ৬০ থেকে ৪০, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে ৪৫ থেকে ৪০, ক্রিমিনোলজিতে ৬০ থেকে ৫০, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারসে ৪০ থেকে ৩০ ও জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষার্থী আসন ৬০ থেকে কমিয়ে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে। আসন বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করা বিভাগগুলোর মধ্যে অর্থনীতিতে ১২৮ থেকে ১৩০, পপুলেশন সায়েন্সেসে ২৫ থেকে ৪০ ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে ২৮ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নৃবিজ্ঞান, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ও প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজে শিক্ষার্থী আসন অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

বড় এ তিনটি অনুষদের বাইরে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলসহ অন্য অনুষদগুলোর বেশির ভাগেরই আসন সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আর কমানোর কথা বলা হলেও সেটি খুবই কমসংখ্যক। আবার বেশকিছু বিভাগে আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদে পাঁচটি বিভাগের মধ্যে চারটিতেই আসন অপরিবর্তিত থাকছে। শুধু পরিসংখ্যান বিভাগের আসন ৮৮ থেকে বাড়িয়ে ৯০ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

জীববিজ্ঞান অনুষদে আটটি বিভাগের মধ্যে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশে ১২০ থেকে ১০০, উদ্ভিদ বিজ্ঞানে ৭৫ থেকে ৭০, প্রাণিবিদ্যায় ১০০ থেকে ৮০ ও মনোবিজ্ঞানে ১৩০ থেকে কমিয়ে ৮০ করার কথা বলা হয়েছে। জিন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগে আসন সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বাকি থাকা প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান, অণুজীব ও মত্স্য বিজ্ঞান—এ তিন বিভাগে শিক্ষার্থী আসন অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদে পাঁচটি বিভাগের মধ্যে তিনটিতে বাড়ছে, একটিতে কমছে ও অন্য একটিতে অপরিবর্তিত থাকছে। এর মধ্যে সমুদ্র বিজ্ঞানে ২৫ থেকে ৪০, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনায় ৩০ থেকে ৪০ ও আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগে ২০ থেকে বাড়িয়ে ২৫টি করার কথা বলা হয়েছে। আর ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে ১২০ থেকে কমিয়ে ৮০ নির্ধারণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ভূতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষার্থী আসন অপরিবর্তিত থাকছে।

ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদে পাঁচটি বিভাগের মধ্যে কোনোটিতেই শিক্ষার্থী আসন কমানোর সুপারিশ আনা হয়নি। নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৫ থেকে ৩০ ও রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ২০ থেকে ২৫ নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। বাকি তিনটি বিভাগে আসন অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

চারুকলা অনুষদের আটটি বিভাগের সাতটিতেই আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকছে। শুধু অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগে ৩০ থেকে কমিয়ে ২৫ করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ফার্মেসিতে আসন সংখ্যা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ ও আইনে ১৩০ থেকে কমিয়ে ১১০ নির্ধারণ করার সুপারিশ আনা হয়েছে। আর ১০টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে তিনটিতে কমানো, দুটিতে বাড়ানো ও বাকি পাঁচটিতে শিক্ষার্থী আসন অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণায় ১৬০ থেকে কমিয়ে ১২০, সমাজকল্যাণ ও গবেষণায় ১০৫ থেকে ১০০ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ১৬০ থেকে কমিয়ে ১৪০ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। আর পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞানে ৩৫ থেকে ৪০ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে।