সততার শাস্তি

রুমিন ফারহানা

মনে আছে সারোয়ার আলমের কথা? নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বারবার আলোচনায় আসেন তিনি। সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিতও হন ভীষণভাবে। বিসিএস ২৭তম ব্যাচে প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে নানা ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আলোচনায় আসেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। দুধে ভেজাল থেকে শুরু করে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধন সামগ্রী বিক্রি বন্ধ, অ্যাপোলো, ইউনাইটেড হাসপাতালে অভিযান চালানো থেকে শুরু করে ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বন্ধ করা, পুরনো ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানা সরানো অভিযান পরিচালনা থেকে শুদ্ধি অভিযান সবটাতেই সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

এছাড়াও করোনার সময় রিজেন্ট হাসপাতালের ভুয়া করোনা রিপোর্ট তৈরির বিরুদ্ধে অভিযান এবং অতি আলোচিত ‘শুদ্ধি অভিযানের’ সময় বিভিন্ন ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনোকাণ্ড আবিষ্কার করেন। সেই সময়ে ১৪২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন এবং উদ্ধার করেন ক্যাসিনো থেকে উপার্জিত অবৈধ প্রায় ২৫ লাখ টাকা। জি কে শামীমের কার্যালয়েও অভিযান চালান তিনি এবং অনেক অবৈধ জিনিস উদ্ধার করেন।

তার অতি আলোচিত কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০২০ সালে হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের বাসায় অভিযান, যেখান থেকে লাইন্সেসবিহীন অবৈধ অস্ত্র, গুলি, এয়ারগান, ইয়াবা, মদ, বিয়ার, ৩৮টি ওয়াকিটকি সেট ও ওয়াকিটকি বেজ স্টেশন, হ্যান্ডকাফ, ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন ইত্যাদি উদ্ধার করা। সেখানে ইরফান সেলিমকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেন সারোয়ার আলম। সেই সময় ভীষণভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে ঘটনাটি।

একটির পর একটি সফল অভিযান, রাঘব বোয়ালদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের আইনের আওতায় আনা, জাতির সামনে জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত মানুষের অনিয়ম অন্যায় বেআইনি কর্মকাণ্ড তুলে ধরা এবং তার নিজস্ব সততা এবং দক্ষতা সম্ভবত তাকে অতি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন কাজ করছেন বাংলাদেশে। এই ভুলে যাবার খেসারতও তাকে দিতে হয়েছে। ইরফান সেলিমের বাসায় অভিযানের পরপরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তাকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।

এখানেই শেষ নয়। ২০২১ সালের মার্চে প্রশাসনের ৩৩৭ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার, কিন্তু পদোন্নতি বঞ্চিত হন সরোয়ার আলম। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন, যা ভীষণভাবে ভাইরাল হয় এবং বিভিন্ন মিডিয়া এটা নিয়ে সংবাদও প্রকাশ করে।

সম্প্রতি দেখা যায়, তার সেই স্ট্যাটাস ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ পরিপন্থী হওয়ার অভিযোগে তাকে ‘তিরস্কারসূচক লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়েছে।

সারোয়ার আলম একা নন। তারই মতো সততার মূল্য চোকাতে হয়েছে প্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা মাহবুব কবির মিলনকে, যিনি দারুণভাবে আলোচিত হয়েছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সর্বত্র ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে জোরালো ভূমিকা রেখে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন সরকারি এই কর্মকর্তা। অনেক সময় সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দফতরের ভেতরে-বাইরে নানা পক্ষের রোষানলেও পড়তে হয়েছে তাকে। নিরাপদ খাদ্যে দায়িত্ব পালনকালে বেশ কিছু বহুজাতিক কোম্পানির ভেজাল ও ক্ষতিকর কোম্পানির পণ্য আটকে দেন তিনি। তার প্রচেষ্টায় বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার এমবিএম আটকে রয়েছে।

মাহবুব কবির মিলন কৃষিপণ্যের জন্য আমদানিকারক ৪১টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকর পণ্য শনাক্ত করেন। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায় থেকে তার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। গুঞ্জন ছিল অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে। হয়েছেও তা-ই। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে জনাব মিলনকে বদলি করা হয় রেল মন্ত্রণালয়ে।

তার এই বদলি যে শাস্তিমূলক সেটি বুঝতে বাকি থাকেনি কারও, তাই এর বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ হয়, এমনকি এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনও হয়। জনাব মিলনকে শেষ পর্যন্ত ওএসডি করা হয় এবং সেই অবস্থায়ই তিনি অবসরে যান।

এ দেশে মানুষের জন্য সত্যিকারের কাজ করতে গেলে যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বরণ করতে হয়, মিলন বা সারোয়ারের ক্ষেত্রে তার চেয়ে আলাদা কিছু হয়নি। এ দেশের মাটিতে জন্মে, এ দেশে চাকরি করে সততা, যোগ্যতা, সাহসিকতার কী পরিণতি হতে পারে, এ দেশে ক্ষমতাবান মানুষদের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মাশুল কী হতে পারে, সেটি তাদের না জানার কথা নয়। তারপরও তারা দাঁড়িয়েছেন, ঠিক যেমনটি দাঁড়িয়েছেন দুদকের সাবেক কর্মকর্তা সরফুদ্দিন আহমেদ। সাবেক বলছি এই কারণে যে সততা আর কাজ করার খেসারত হিসেবে চাকরি পর্যন্ত খোয়াতে হয়েছে তাকে।

শরিফ উদ্দিন চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় কক্সবাজারে ৭২টি প্রকল্পে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, রোহিঙ্গা নাগরিকদের ২০টি এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করেন। তার কর্মদক্ষতা প্রমাণের জন্য এটুকু তথ্যই যথেষ্ট যে চট্টগ্রামে সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালনের সময় দুর্নীতির মোট ৩০টি মামলা করেন শরিফ উদ্দিন। এরমধ্যে অভিযোগপত্র দেন ১৫টির। অনুসন্ধান শেষে মামলার সুপারিশ করেন আরও ২২টির। বদলির আগ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের দুর্নীতির মোট ৪৫টি মামলার তদন্ত করছিলেন।

শরিফ কতটা সাহসী কর্মকর্তা ছিলেন তার একটা ছোট্ট নজির হলো, গত বছরের জুনে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ প্রদান করায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপকসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।

শরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবাব দেবার সুযোগ দেওয়ার পর অপসারণ করা বা তাকে শাস্তি দেওয়া দুদকের জন্য নিশ্চিতভাবেই স্বস্তিদায়ক কিংবা সহজ ছিল না। আর তাই দুদককে সাহায্য নিতে হয়েছে দুদক চাকরি বিধির অতি বিতর্কিত ৫৪(২) ধারার, যেখানে বলা আছে কর্তৃপক্ষ যে কাউকে কোনও কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারে। ন্যাচারাল জাস্টিসের মৌলিক ধারণা এবং বাংলাদেশ সংবিধানের ১৩৫(২) পরিপন্থী এমন একটি ধারা দুদক আইনে থাকাটা অবিশ্বাস্য। এমন ধারার অস্তিত্ব থাকাটা প্রমাণ করে, দুদক কর্মকর্তাদের জন্য সরকারের বেঁধে দেওয়া একটা চৌহদ্দি আছে, যার ভেতরে আছে বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিরোধী মতের মানুষ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের আইওয়াশ দেওয়ার জন্য সরকারদলীয় কিছু চুনোপুঁটি আর তদন্তের নামে প্রহসন করে ‘মাসুম’ সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য কিছু সরকারদলীয় রাঘব-বোয়াল। কেউ যদি সত্যিকারভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংযুক্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অতি প্রভাবশালীদের ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দিতে যায়, তাঁকে মুহূর্তেই যেন শায়েস্তা করে ফেলা যায়, সেই পরিকল্পনা করে রাখা হয়েছিল ২০০৮ সালে তৈরি দুদক বিধিমালাতেই।

ফিরে আসি সারোয়ার আলমের অতি আলোচিত স্ট্যাটাসটিতে। পদোন্নতি বঞ্চিত হবার পর তিনি ফেসবুকে লিখেন, ‘চাকুরী জীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন তাদের বেশিরভাগই চাকুরী জীবনে পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন এবং এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যায়’। অল্প কয়েকটি কথা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই যেন পুরো পরিস্থিতি দৃশ্যমান। যে দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যায়, যেখানে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গেলে প্রতি পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয়, সেখানে আর যাই হোক সৎ, দক্ষ, যোগ্য, বিবেকবান মানুষ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায় এবং সার্বিক অবক্ষয়ের সূচনা সেখানেই।

লেখাটি শেষ করছি একটা ভালো খবর দিয়ে। অন্যায়ভাবে বরখাস্ত হবার ৫ দিন পর এবং বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারের ২ দিন পর আবার টিকিট চেকিংয়ের নিয়মিত দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন টিটিই শফিকুল ইসলাম। আশা করছি তার এই বিজয় তাকে দায়িত্ব পালনে আরও বেশি সৎ এবং উদ্যমী করে তুলবে। সারোয়ার, মিলন, শফিকুল বা শরিফ উদ্দিনের মতো মানুষকে যতদিন পর্যন্ত না আমরা সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবো, ততদিন পর্যন্ত আমাদের মুক্তি নেই।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।