কেন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে টেলিটক?

২০০৪ সালে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টেলিটক প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়। দেশব্যাপী টেলিকমিউনিকেশন সেবা নিশ্চিত, একইসঙ্গে খাতটিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করতে এ মোবাইল ফোন অপারেটরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পরও সরকারের পক্ষ থেকে প্রচুর সুবিধা পেয়েও এ মোবাইল ফোন অপারেটরটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

এমনকি বিভিন্ন পরীক্ষাসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবায় এ সিমের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। দিয়েছে ৪জি ও ৫জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ পাওয়ার অগ্রাধিকার গুরুত্ব, এরপরও দেশের বাজারে জায়গা করে নিতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে এ টেলিসেবা প্রতিষ্ঠানটি?

দেশে প্রায় ১৮ কোটি মোবাইল সাবস্ক্রাইবার রয়েছে, যেখানে টেলিটকের গ্রাহক মাত্র ৬৬ লাখ। অর্থা মোট গ্রাহকের ৩.৬৬% টেলিটক গ্রহীতা। এ বাজারও প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত এ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

তাহলে টেলিটকের বিকাশের পথে বাধাগুলো কী কী?

দেশব্যাপী টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফাইবার@হোম- এর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাব্বির বলেন, বর্তমানে বিশ্বে বাণিজ্য খুবই গতিশীল। বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাসহ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করে তুলেছে। এক্ষেত্রে সরকার পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটিরও বেশ দুর্বলতা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সমস্ত সরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং তাদের সচিবদের নেতৃত্বে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সচিবরা কোম্পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। “ব্যবসার সঙ্গ সংশ্লিষ্ট নন, এমন ব্যক্তিরা যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে থাকেন, তবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব নয়।”

টেলিটকের ব্যর্থতার পেছনে এটিও জবাবদিহিতার অভাব অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন এ টেলিকম বিশেষজ্ঞ।

তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি কোনো খাতে একচেটিয়া ব্যবসাকে মোকাবিলার একটি কার্যকর উপায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। “এছাড়াও, টেলিটক দুর্গম এলাকায় টেলিকম সেবাদানে অবদান রেখেছে, যেখানে অল্প আয় হবে একারণে বেসরকারি অপারেটররা যেতে চায় না।”

অন্যদিকে, টেলিটকের এ অবস্থার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর অভাবকে দায়ী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স ও মেকাট্রোসিক্স বিভাগের অধ্যাপক লাফিফা জামাল।

তিনি বলেন, “দীর্ঘসময় ধরে টেলিটক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারছে না, মূলধনের অভাবের কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। এজন্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এর গ্রাহকদের। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আশানুরূপভাবে এগোতে পারছে না।”

“প্রত্যাশিত গতিতে না হলেও কোম্পানিটি এখন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।” অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বাড়ালেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আমলাতান্ত্রিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও জবাবদিতিহার অভাবই টেলিটকের পিছিয়ে পড়ার কারণ বলে মনে করছেন আরও বেশ কয়েকজন টেলিকম বিশেষজ্ঞ। এছাড়া, এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে একটি নীতি প্রণয়ন বা প্রয়োগ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, এটিও অন্যতম প্রধান বাধা বলেও মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, টেলিটককে কোনো বাণিজ্যিক কারণে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল টেলিসেবা খাতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত এবং আন্তঃদেশীয় ডিজিটাল বিভাজন দূর করা।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের কেবল বাণিজ্যিক দিক নয়, অন্যান্য দিকগুলোও দেখা উচিত। টেলিটকের সমালোচনার আগে, অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।”

সীমিত বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ

টেলিটকের অন্য তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর ভেতর গ্রামীণফোন প্রায় ৪২,০০০ কোটি টাকা, রবি ৩৩,০০০ কোটি টাকা এবং বাংলালিংক ২৪,০০০ কোটি টাকা দিয়ে বিনিয়োগ শুরু করে। অন্যদিকে, টেলিটক মাত্র ৬৪২ কোটি টাকা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এ খাতে প্রবেশ করে। বর্তমানে বিনিয়োগ পৌঁছেছে ৪,৯০০ কোটি টাকায়। সীমিত বিনিয়োগের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবসা করছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, দেশের মোট মোবাইল সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১৮.১০ কোটিতে পৌঁছেছে। এর ভেতর গ্রামীণফোনের ৮.৩৪ কোটি, রবির ৫.৩৬ কোটি এবং বাংলালিংকের ৩.৭২ কোটি ব্যবহারকারী ছিল।

ব্যবহারকারীদের অভিযোগ

রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা মো. মামুন মুনতাসির কিছু সরকারি পরিষেবা পেতে একটি টেলিটক সিম কেনেন। কিন্তু, রিচার্জ করা বা কাস্টমার কেয়ার নিয়ে তাকে প্রতিনিয়তই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

শুধু মামুন নয়, হাজার হাজার মানুষ রয়েছে যাদের এ কারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মূলত সরকারি কিছু সেবা পেতেই টেলিটক ব্যবহার করেন তারা। অন্যদিকে, অন্যান্য মোবাইল অপারেটরগুলোর রিচার্জ করার ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজলভ্য।

অনেক বিক্রেতা বলেন, তারা টেলিটক রিচার্জ পরিষেবা দিতে ইচ্ছুক। তবে অপারেটরটির মার্কেটিং টিমের দেখা মেলে না সহজে, তাদের থেকে ব্যালান্স পেতে সমস্যার কারণে তারাও গ্রাহকদের রিচার্জ সুবিধা দিতে পারছেন না।

অপর্যাপ্ত কাস্টমার কেয়ার সেন্টার, কল সেন্টার হওয়ায় অন্য টেলিসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যেতে বাধ্য হন গ্রাহকরা।