শীতল যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্র একযোগে চীন ও রাশিয়ার সাথে নতুন শীতল যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। দেশটি মানবাধিকারের প্রশ্নে সকল শত্রুকে স্যাংকশন দিচ্ছে, অথচ বাইডেন সৌদি আরব যাচ্ছেন। সৌদি আরবে খাশুকজি, LGBT নিষিদ্ধ, মৃত্যুদণ্ড চালু থাকার মতো সক্রিয় ইস্যু রয়েছে। এই অবস্থায় সৌদি ভ্রমণ পুরোপুরি ভণ্ডামি হিসেবেই প্রতিভাত হয়।

এ ধরনের ভণ্ডামি ইঙ্গিত করে যে, বিশ্বে এতকাল অ্যামেরিকা যে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে তা থেকে তারা সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ এমন কিছু ঘটেছে, যা মার্কিন আধিপত্যকে সত্যিই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। “আয়রন কার্টেন” এর পতনের পর তিন দশকের মার্কিন নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, ২০০৮ সালে মন্দা এসেছে, দেশের মাঝে আন্তঃধর্ম ও বর্ণ বৈষম্য উস্কে উঠেছে, ওপিওড মহামারির আঘাত, নির্বিচার গোলাগুলি, কোভিড অতিমারি, অসহনীয় তেল যুদ্ধ ও অন্যান্য সংকট অ্যামেরিকার অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের উপর আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আমেরিকা অবস্থানচ্যুত হতে চায় না। কিন্তু এটা অনিবার্য যে, অর্থনৈতিকভাবে চীন সকল সূচক ও নির্দেশকে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। চীনের জনসংখ্যা আমেরিকার চেয়ে চারগুণ বেশি; এর অর্থনীতিও অনেক বছর ধরে আমেরিকার তিনগুণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। PPP সক্ষমতায় ২০১৫ সালে তারা আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে।

আর, নতুন শীতল যুদ্ধের ফ্রন্ট কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের পূর্বে ভালোভাবেই খোলা হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পূর্ব থেকেই ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদী হুমকি, চীন থেকে মনোযোগ সরানো যাবে না। রাশিয়ার অর্থনীতি তো স্পেনের মতো একই আকারের ক্ষুদ্র, যদিও তেল সম্পদ রয়েছে।

কিন্তু যুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেছে, তখন কৌশল দরকার। মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় এককভাবে জয়লাভ করা যায় না; বন্ধু ও মিত্র প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক মিত্র হচ্ছে ইউরোপ এবং বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো। কিন্তু ট্রাম্প তাদের সাথে সম্পর্কের আন্তরিকতা বিনষ্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

একই সময়ে চীন দরিদ্র দেশগুলিকে অবকাঠামো দিয়ে সজ্জিত করার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে, যদিও এই দেশগুলি প্রায়শই গভীরভাবে ঋণে আটকে থাকে। শীতল যুদ্ধে অপরকে আকর্ষণ ও প্ররোচনার নরম শক্তি দিয়ে জয় আসে। জয়ী হতে বাকি বিশ্বকে কেবল পণ্য নয়; সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রপ্তানি করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্র সেরা বোমারু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে বটে, কিন্তু বিশ্ব তাদের সহায়তার প্রত্যশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাদের মনোযোগের অভাবেই তাদের প্রধান সহযোগী- পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে। আর, যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ বন্দুক সহিংসতা, বর্ণবাদের উস্কানী ও নারীদের প্রজনন অধিকার সুরক্ষা নিয়ে জর্জরিত।

এই অবসরে ইউক্রেনে হামলা করে রাশিয়া সমগ্র বিশ্বকে জর্জরিত করেছে। চীন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সৌদি আরব তার তেল সম্পদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে এবং নিজে আঞ্চলিক পরাশক্তি ও আধিপত্যবাদী বলয় তৈরি করেছে।