শরীর ভেজা এই সময়ে শিশুদের কিছু রোগ ও করণীয়

ডা. সৈয়দা নাফিসা ইসলাম

চলছে বর্ষাকাল। এ সময়ে বড়দের সচেতনতার পাশাপাশি শিশুদের ওপর রাখতে হবে বাড়তি খেয়াল ও যত্ন। এখন দেশের বৃহৎ একটি অংশই অতিবৃষ্টি ও বর্ষাজনিত কারণে বন্যায় আক্রান্ত এবং এই সময়টাতে বন্যাজনিত কারণে খাবার পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। এর ফলে বড়দের সঙ্গে শিশুরা ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হওয়ার কারণে ঠাণ্ডা বাতাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবাণু বেড়ে যায়। এতে সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়ার শিকার হয় শিশুরা। এই ভেজা মৌসুমে মশার বংশবৃদ্ধি ও ডেঙ্গু মশার বংশবৃদ্ধি ও মশার কারণে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। আবার ডেঙ্গু জ্বরের কারণে অনেকের জীবন অকালেই ঝরে যায়। তাই ভেজা বা বন্যায় আক্রান্ত এ সময় কীভাবে শিশুদের সুরক্ষা দেয়া যায় তা জানা জরুরি।

বন্যা থেকে সুরক্ষা যেভাবে

বন্যাজনিত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিবারের পিতামাতারা শিশুদের নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকেন। তাই যেসব এলাকায় বন্যায় আক্রান্ত এবং শিশুরা ঝুঁকিতে আছে, তাদের পিতামাতাদের উচিত যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া।

যদি সম্ভব না হয় তাহলে প্রতিবেশী কারো সহায়তা বা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের সহায়তা নিয়ে নিজের বাসস্থানটি উঁচু মাচায় তৈরি করা বা ইট দিয়ে চকি, খাট ইত্যাদি উঁচু করে নেয়া। শিশুরা যাতে নিরাপদে থাকে তা লক্ষ্য রেখে উঁচু বাসস্থানটি তৈরি করতে হবে এবং খাবার পানি যাতে বিশুদ্ধ থাকে তা লক্ষ্য করতে হবে। রাতে মশারি অবশ্যই টানাতে হবে। এতে করে মশা ও সাপের কামড় থেকে বাঁচা যাবে। ছোট শিশুরা যাতে স্যাঁতসেঁতে ও ভিজা না থাকে তাও খেয়াল রাখতে হবে। দুরন্ত শিশুরা যাতে পানিতে না নামে বা খেলতে না পারে তা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশুরা অতিরিক্ত পানিতে থাকলে তাদের পায়ের আঙুলের চিপায় ঘা হয়ে যেতে পারে ও ইনফেকশন হয়ে প্রচণ্ড ব্যথা করতে পারে। এ সময় প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো সঙ্গে রাখতে হবে এবং এএমসির ওর স্যালাইন অবশ্যই সংগ্রহে রাখতে হবে।
ডায়রিয়া

শিশুর জন্য পানীয়জল, কখনো তার খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত অনিরাপদ ট্যাপের পানি থেকে শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। বর্ষায় জলাবদ্ধতায় মল বা ময়লা পানিতে মিশে ব্যবহার্য পানি অনিরাপদ হয়ে ওঠে। ফলে রোটা ভাইরাস, হেপাটাইটিস ‘এ’, কলেরা, এন্টা এমিবা পরজীবী, সালমোনিলা প্রভৃতি জীবাণু ডায়রিয়ার প্রধান কারণ। ডায়রিয়ার কারণে শিশু পানিস্বল্পতায় ভোগে। তাই এ রোগে স্বাভাবিক খাবার না খেলে শিশুর ওজন কমে যাবে, রক্তে ইলেকট্রোলাইটস বা লবণের ঘাটতি হয়ে শিশু মারাও যেতে পারে। ডায়রিয়ার শুরু থেকেই খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুকে ডায়রিয়াজনিত বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়। এতে করে শিশুর পানিস্বল্পতা ও বমি এক-তৃতীয়াংশ এবং পায়খানার পরিমাণ এক-পঞ্চমাংশ হ্রাস পায়। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করানো, শিশুর পানীয়জল ও খাবার তৈরিতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা গ্রহণ, রোটাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন ব্যবহার করে শিশুকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ডায়রিয়াকালীন শিশুকে জিঙ্ক সেবনে ডায়রিয়ার মেয়াদ ও তীব্রতা দুই-ই হ্রাস পাবে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা

এ সময় অনেক শিশুই সর্দিজ্বরে ভোগে আবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। ছোট্ট শিশুরা নিউমোনিয়ার সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় বা রোগীর ব্যবহার্য দ্রব্যাদির সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। শিশুকে তাই কাশির রোগী থেকে দূরে রাখতে হবে। সাবান-জলে হাত না ধুয়ে শিশু যেন না খায়। ঘন ঘন চোখ, মুখ, নাক যেন সে না ধরেÑ এ বিষয়ে তাকে সচেতন করে তুলতে হবে। কারণ এসব পথে জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। কাশির নিরাপদ উপশমে শিশুকে মধু, তুলসীপাতার রস, লেবু মিশ্রিত কুসুম গরম নিরাপদ পানি খাওয়ানো যায়। জ্বর হলে শিশুর ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ ও বারবার তরল পানীয় পান করানো উচিত যাতে শিশু পানিস্বল্পতায় না ভোগে ও তার কিডনির কার্যক্রম সচল থাকে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে

এই জ্বরে আক্রান্ত শিশু প্রথম কয়েক দিন উচ্চমাত্রার জ্বরে ভোগে। মেরুদণ্ডে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, কখনো বা মাড়ি, মলপথে রক্তপাতসহ হেমোরেজিক ডেঙ্গু প্রকাশ পায়। সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরে প্যারাসিটামল খাওয়াবেন। এসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন করাবেন না, ঘন ঘন পানীয় ও তরল খাবার খাওয়ানো উচিত। রক্তপাত দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তিপূর্বক রক্ত, অণুচক্রিকা ইত্যাদি সঞ্চালন করে চিকিৎসা দিতে হয়। বৃষ্টির জমানো পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করে। ফলে এরূপ স্থান যাতে বাসা বা বিদ্যালয়ের বা বসতির আশেপাশে না থাকে সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। ফুলের টব, ডাবের খোসা, ক্যানের খালিপাত্র, গাড়ির টায়ার, হাঁড়ি-পাতিল এসবে বর্ষার স্বচ্ছ জল জমা থাকতে পারে। এগুলো বাসা থেকে সরিয়ে ফেলুন।

লেখক: কনসালটেন্ট, শিশু বিভাগ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
চেম্বার: (১) ডা. নাফিসা’স চাইল্ড কেয়ার, শাহ মখদুম, রাজশাহী।
(২) আমানা হাসপাতাল, ঝাউতলী মোড়, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী।
মোবাইল-০১৯৮৪১৪৯০৪৯।