সিইসি’র টোপ, নতুন কোনো হাতিয়ার?

সিইসি’র টোপ, নতুন কোনো হাতিয়ার?

শামীমুল হক

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- তাহলে তিনি কি নিশ্চিত করেই জানেন রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়ার কোনো ধরনের সম্ভাবনা নেই? ক’দিন আগেই সিইসি জানিয়েছিলেন আগামী নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম-এ ভোট হবে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা বয়ে যায়। দেশের ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতিতে ইসি’কে ইভিএম-এ ভোট না করার আহ্বান জানান। ওদিকে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি তো বলেই দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনেই যাবে না। ইভিএম’র ব্যাপারেও তাদের স্পষ্ট মত- এ দেশে ইভিএম-এ নির্বাচন হবে না। কারণ ইভিএম ত্রুটিযুক্ত। অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে আর ইসি’র সঙ্গে মতবিনিময়ে দলটি ৩০০ আসনেই ইভিএম-এ ভোট চেয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ইভিএম ও ব্যালটকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে তিনি সবক’টি আসনে ব্যালটে নির্বাচন দেবেন। বুধবার তিনি খোলাসা করেই তা জানিয়ে দিয়েছেন। তার এ ঘোষণার পর নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সর্বত্র।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- তাহলে তিনি কি নিশ্চিত করেই জানেন রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়ার কোনো ধরনের সম্ভাবনা নেই? ক’দিন আগেই সিইসি জানিয়েছিলেন আগামী নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম-এ ভোট হবে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা সমালোচনা বয়ে যায়। দেশের ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতিতে ইসি’কে ইভিএম-এ ভোট না করার আহ্বান জানান। ওদিকে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি তো বলেই দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনেই যাবে না। ইভিএম’র ব্যাপারেও তাদের স্পষ্ট মত- এ দেশে ইভিএম-এ নির্বাচন হবে না। কারণ ইভিএম ক্রটিযুক্ত। অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। আর ইসি’র সঙ্গে মতবিনিময়ে দলটি ৩০০ আসনেই ইভিএম-এ ভোট চেয়েছে। দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে যখন বিপরীতমুখী অবস্থান তখন সিইসি কোন উদ্দেশ্যে বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে ব্যালটে নির্বাচন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- সিইসি’র একমুখে দুই কথার অর্থ কি? তিনি কি সেই সব রাজনৈতিক দলের প্রতি টোপ দিয়েছেন? যারা ইভিএম-বিরোধী।
তার এ কথা শুনে ইভিএম-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দৌড়ঝাঁপ শুরু করবে সমঝোতার জন্য। প্রতিপক্ষের কাছে ধরনা দেবে দ্রুত সমঝোতা করার জন্য। কারণ সিইসি বলেছেন, সমঝোতা হলে ব্যালটে নির্বাচন হবে। তারাওতো ব্যালটেই নির্বাচন চান। সিইসি কি মনে করেছেন ইভিএম-বিরোধী দলগুলো এখন খুশিতে আত্মহারা হবে। কারণ সিইসি তো তাদের কথাই বলছেন। সিইসিকে ভাবতে হবে- কেউই এত বোকা নন। এখন সাধারণ মানুষও প্রতিটি শব্দের ব্যাখ্যা করেন। তরজমা করেন। কেন বলা হলো? নেপথ্যে কি? সিইসি’র ইভিএম নিয়ে ইউটার্ন বক্তব্যও তেমন আলোচনায় এখন। কেউ কেউ বলছেন, সিইসি পদে গেলে সবাই বুদ্ধিমান হয়ে যান। ইতিমধ্যে তিনি বুদ্ধির পরিচয়ও দিয়েছেন নানাভাবে। সাবেক দুই সিইসি কাজী রকীব উদ্দিন ও কেএম নূরুল হুদার বুদ্ধিও মানুষ দেখেছে। ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের বুদ্ধি উপচেপড়ার মতো ছিল। তাদের অনেক কথা হাস্যরসের খোরাক জুগিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর সিইসিদের চোখ খুলে যায়। যেমনটি খুলেছে কেএম নূরুল হুদার। ক’দিন আগে নির্বাচন নিয়ে তার মুখে হতাশার বাণী শোনা যায়। তার মতে সুষ্ঠু নির্বাচনী ধারায় ফিরতে বাংলাদেশের সময় লাগবে আরও দুইশ’ বছর। এক্ষেত্রে তিনি ইংল্যান্ডের উদাহরণ তুলে ধরেন। কেএম নূরুল হুদা দাবি করেন, ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নিয়ে করার কিছুই ছিল না তাদের। সরকার নয় বরং সরকারি দলের কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল সেই নির্বাচন।

দায়িত্ব ছাড়ার ছয় মাস পর চ্যানেল টোয়েন্টি ফোর-এর মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর তার এমন বক্তব্য আর সিইসি থাকাকালে তার বক্তব্যের মধ্যে আকাশ- পাতাল ব্যবধান। সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালও অতীতের ধারাবাহিকতায় এগুচ্ছেন বলেই মনে হয়। নাহলে নির্বাচন কমিশন কেন রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে তাকাবেন? তারা তো সাংবিধানিক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সরকার, আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে তাদের নতজানু হওয়ার সুযোগ নেই। পুরো প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীও নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকবে নির্বাচনের সময়। ইভিএম অথবা ব্যালট পেপার কোনটায় ভোট গ্রহণ করা হবে- তাও নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কখনই তারা বলতে পারেন না এমনটা হলে তেমনটা হবে। পাঁচ বছর আগে নির্বাচন কমিশন নিয়ে লিখেছিলাম ইসি’র চোখে কালো চশমা। সে লেখায় প্রশ্ন তুলেছিলাম- সিইসি ও তার সহকর্মী কমিশনারদের ক্ষমতা কতটুকু? তারা কি ইচ্ছা করলেই সাধারণ নাগরিকের মতো কথা বলতে পারেন? সাধারণ মানুষ খালি চোখে যা দেখেন তারাও কি সরাসরি তা দেখতে পান? দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বলা যায় তারা তা পারেন না। কারণ তাদের ভরসা করতে হয় অন্যদের ওপর। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর। কর্মকর্তারা যা লিখে দেন তা-ই তারা পড়ে যান শুধু।

এ কারণেই আমজনতা যা দেখেন তারা তা দেখেন না। তারা উল্টোটা দেখেন। যাদের উপর ভরসা তাদের রিপোর্ট বিশ্বাস করেন। তা অকপটে দেশবাসীকে জানান দেন। সেই রিপোর্ট সত্য না মিথ্যা তাও যাচাই করার ক্ষমতা নেই নির্বাচন কমিশনের। অর্থাৎ ইসি সবসময়ই কালো চশমা পরিহিত থাকে। দেশের নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কতটুকু এ থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়। একটু বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হবে। ২০০০ সালের ২৩শে মে সাবেক সচিব এমএ সাঈদ সিইসি হিসেবে নিয়োগ পান। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এমএ সাঈদের অধীনে ২০০১ সালের নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি জোট। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমএ সাঈদ সিইসি হলেন, সেই এমএ সাঈদই আওয়ামী লীগের বিরাগভাজন হয়ে গেলেন। একের পর এক নির্বাচন হতে থাকলো বিরাগভাজনের মাত্রাও বাড়তে থাকলো। সে সময় এমএ সাঈদের সঙ্গে কমিশনার হিসেবে ছিলেন শফিউর রহমান, একেএম মোহাম্মদ আলী ও এমএম মুনসেফ আলী। এরমধ্যে শফিউর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এমএ সাঈদের সঙ্গে শফিউর রহমানের মান-অভিমান প্রকাশ্যে চলে আসে। যা একসময় দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। এ নিয়ে বেশ লেখালেখিও হয়।

অপরদিকে সিইসি’র কর্মকাণ্ডে ক্ষমতায় থাকা বিএনপিও এমএ সাঈদের উপর চরম বিরক্ত। এরই মধ্যে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য কামাল বখ্‌ত সাকী মারা যান। সেখানে উপ-নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। আর সেই উপ-নির্বাচন সরজমিন দেখতে যাবেন সিইসি এমএ সাঈদ। সঙ্গী নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ক’জন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা। সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে রওয়ানা দিই সিইসি’র সঙ্গী হিসেবে। চল্লিশ মিনিট আকাশে উড়ার পর সাতক্ষীরার মাটি স্পর্শ করলো হেলিকপ্টার। জেলা প্রশাসন প্রস্তুত। প্রথমেই সিইসি ও তার সফর সঙ্গীদের নিয়ে যাওয়া হলো সার্কিট হাউসে। সেখানে গার্ড অব অনার দেয়ার পর নাস্তা। এরপর তালা ও কলারোয়ায় সরজমিন কেন্দ্র পরিদর্শন। একের পর এক কেন্দ্র পরিদর্শন করে যাচ্ছেন সিইসি। কিন্তু কোথাও সুষ্ঠু ভোট হচ্ছিল না। প্রকাশ্যে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগও শুনলেন সিইসি। বেলা আড়াইটায় কলারোয়ার এক কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল একটি বুথে ভোট পড়েছে মাত্র ১৩টি। শুনে সিইসি এমএ সাঈদ বললেন এটা নির্বাচনী রেকর্ড। ইতিহাস হয়ে থাকবে। এরপর আরও কিছু কেন্দ্র ঘুরে ঢাকায় ফেরা। কি আশ্চর্য! পরদিন সিইসি এমএ সাঈদ উপ-নির্বাচন নিয়ে ব্রিফ করলেন জেলা প্রশাসনের পাঠানো রিপোর্ট দেখে। যেখানে বলা হয়েছে নির্বাচন হয়েছে স্বচ্ছ। ভোটারের উপস্থিতিও ছিল ব্যাপক। তিনি যা দেখে এলেন তার কিছুই বলতে পারলেন না। কারণ কালো চশমায় তার নিজ চোখে দেখা সবকিছু ঢেকে দিয়েছে।

অবশ্য এমএ সাঈদ বিষয়টি মেনেও নিতে পারেননি। তাইতো ২০০৪ সালের ১লা জুলাই হওয়া ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচনের আগে তিনি ছুটি নিয়ে চলে যান দেশের বাইরে। আর তখন সিইসি’র দায়িত্ব পান আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কমিশনার শফিউর রহমান। আশায় বুক বাঁধে সবাই। এবার নির্বাচন জমবে ভালো। সে সময় বিএনপি’র টিকিটে নির্বাচিত ঢাকা-১০ আসনের এমপি মেজর (অব.) আবদুল মান্নান সংসদ থেকে পদত্যাগ করে যোগ দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এ। এর ফলে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। উপ-নির্বাচনে বিএনপি মনোনয়ন দেয় মোসাদ্দেক আলী ফালুকে। আর বিকল্পধারা বাংলাদেশ থেকে নির্বাচন করেন মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। সে নির্বাচনে সকালেই কেন্দ্র দখল হয়ে যায়। বিকল্পধারার প্রার্থী আবদুল মান্নান বেলা ১১টায় প্রেস ব্রিফিং করে কেন্দ্র দখল, জাল-জালিয়াতির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। মেজর (অব.) মান্নানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ইসিতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসেন। অবাক করা বিষয় ভারপ্রাপ্ত সিইসি শফিউর রহমান সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন। তিনি অকপটে বলে যান, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আর সুন্দর নির্বাচন উপহার দেয়ায় তিনি সকল রাজনৈতিক দল, ঢাকা-১০ আসনের সকল ভোটার ও প্রার্থীদের কৃতজ্ঞতা জানান। ধন্যবাদ জানান নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। তার এ বক্তব্যের পর সবাই তাজ্জব।

নির্বাচনে কি হলো আর তিনি কি বললেন। আসলে সিইসি কে হলো না হলো তা ফ্যাক্টর নয়। ফ্যাক্টর হলো কালো চশমা। এ কালো চশমা খোলার ব্যবস্থা এ পর্যন্ত কেউই করেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১২ জন সিইসি বিদায় নিয়েছেন। ১৩তম সিইসি হলেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। কাজী হাবিব কমিশনের কাছেও আশা করার কিছু নেই। কারণ এ কমিশনকেও অন্যসব কমিশনের মতো আমলাদের ওপর ভরসা করতে হবে। অবশ্য প্রথমদিনই কাজী হাবিব নিজেকে স্মার্ট হিসেবে তুলে ধরেন দেশবাসীর সামনে। তারপর একে একে নানা কথায় বিতর্ক তৈরি করতে থাকেন। শুরুতেই তিনি বলেছিলেন ইভিএম-এ নির্বাচন করতে ইসি রাজি নয়। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এতে বেশির ভাগ দল ইভিএম’র বিপক্ষে কথা বলেন। তারপরই তিনি ঘোষণা দেন ১৫০ আসনে ইভিএম-এ ভোট হবে। ক’দিন যেতে না যেতেই আবার বলেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে সব আসনে ব্যালটে ভোট হবে। এতদ্রুত তার অবস্থান বদল মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। তারা বলছেন, এটা সিইসি’র নতুন কোনো টোপ নয় তো?