স্বল্প পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানিতে যত কারসাজি

স্বল্প পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানিতে যত কারসাজি

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কম তাদের শেয়ার সংখ্যাও কম। ফলে স্বল্প পরিশোধিত মূলধন (লো পেইড আপ ক্যাপিটাল) কম আছে এ রকম কোনো একটি কোম্পানির শেয়ার যার কাছে বেশি থাকবে, তিনি চাইলেই সেই কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে অনেক বেশি মুনাফা করতে পারেন। এতে কোম্পানিটির ব্যবসায় লাভের বিপরীতে যদি লোকসানেও থাকে তারপরও সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম হয় আকাশচুম্বী। আর তখন গ্যাম্বলিংয়ের এই পথে কারসাজিকারীকে অনুসরণ করে দু-একজন লাভবান হলেও অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে লো পেইড আপ ৩২টি কোম্পানির বাজার চিত্র এবং আর্থিক প্রতিবেদনের পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেরই ব্যবসার অবস্থা খারাপ। কিন্তু কোম্পানিগুলো স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি হওয়ায় সেগুলো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। সেই সঙ্গে লোকসানে থাকা কোম্পানির শেয়ারের দামও রয়েছে কয়েকশ টাকায়।

পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায় ভালো অবস্থানে থাকা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টসের শেয়ার দর বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ছিল ২ হাজার ৩৭ টাকা ১০ পয়সা। কোম্পানিটি সর্বশেষ হিসাব বছরে ১৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। ২০২১ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ছিল ৫২ টাকা ১৮ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ২২৭ টাকা ৬৩ পয়সা। সে হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারদর অনেক বেশি হলেও এর ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ভালো। তবে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে কোম্পানিটি একটি স্বল্প পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি। এতে কোম্পানির বর্তমান ব্যবসার অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনুসারে এর শেয়ারদর অতিমূল্যায়িত করে এত বেশি করা হয়েছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।

এছাড়া একইভাবে ব্যবসা ভালো এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভালো অবস্থানের কারণে স্বল্প পরিশোধিত মূলধনের আরও কিছু কোম্পানির শেয়ার দর অতিমূল্যায়িত করে অনেক বেশি করা হয়েছে বলে জানান তারা। এর মধ্যে ফার্মা এইডস ও বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজারও রয়েছে। কোম্পানি দুটির ব্যবসায় মুনাফায় প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা থাকায় এবং ভালো লভ্যাংশ দেয়ায় তাদের শেয়ারের দর অতিমূল্যায়িত করা হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে কোম্পানি দুটি স্বল্প পরিশোধিত মূলধনের হওয়ার ফলে।

এদিকে কিছু লোকসানে থাকা এবং ধারাবাহিকভাবে ব্যবসায় অবনতি হওয়া কোম্পানির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজার থেকে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুত হতে চাওয়া সাভার রিফ্র্যাক্টরিজের দর সর্বশেষ ছিল ২৬১ টাকা ১০ পয়সা। অথচ কোম্পানিটির ২০১২-১৬ ৫ বছরে ব্যবসার কোনো উন্নতি নেই এবং ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর এতই অবনতি হয়েছে যে গত ২০১৪-১৬ তিন বছরে কোম্পানিটি লোকসানে ছিল। আর সর্বশেষ চলতি ২০২২-২৩ হিসাব বছরের নয় মাসে শেয়ার প্রতি কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ৮৭ পয়সা এবং এনএভি হয়েছে মাত্র ৭ পয়সা। এরকম একটি লোকসানি কোম্পানির শেয়ার দর এত কীভাবে হলো? এমন প্রশ্নে দেখা যায়, কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। যার ফলে কারসাজি চক্র সহজেই কোম্পানিটির অবস্থা খারাপ হলেও এর শেয়ার দর এভাবে বাড়িয়ে মুনাফা করেছে বলে মত দেন কয়েকজন বিশ্লেষক।

ঠিক একইভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে লোকসানে থাকায় এবং ভালো ইপিএস, এনএভি ও লভ্যাংশ না দিয়েও লো পেইড আপ কোম্পানি হিসেবে অতিমূল্যয়িত শেয়ার দর রয়েছে আজিজ পাইপস, জিলবাংলা, ন্যাশনাল টি, ইমাম বাটন, জেমিনি সি ফুড, শ্যামপুর সুগারসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি।

বাজার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলছেন, বাজারে কয়েকভাবে ‘গ্যাম্বলিং’ হয়ে থাকে। যেমন সিরিজ ট্রেডিং, সার্কেল ট্রেডিং, কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে ট্রেডিং। ঠিক এমনিভাবে লো পেইড আপ কোম্পানির শেয়ার নিয়েও কারসাজি হয়ে থাকে।

দেখা যায়, একটি চক্র কিছু স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানির বেশ কিছু শেয়ার সর্বনিম্ন দামে কিনে নেয়। এতে তাদের খুব বেশি বিনিয়োগ করতে হয় না। পরে যখন বাজারে সেই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের চাহিদা বেড়ে যায় এবং শেয়ারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে না, তখন কারসাজি চক্র ধীরে ধীরে অনেক বেশি দামে শেয়ার বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিক্রি করতে থাকে। এতে তাদের শেয়ারগুলো বিক্রি শেষ হয়ে গেলে যখন গ্যাম্বলাররা শেয়ারগুলো থেকে বের হয়ে যায় তখন বিপদে পড়ে বেশি দামে কিনে নেয়া বিনিয়োগকারীরা। আর বড় একটা অংশ মুনাফা করে নেয় কারসাজি চক্র।

তারা বলেন, এভাবে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে আসছে অনেকে। মাঝে মধ্যে কিছু শেয়ারের বিষয়ে কয়েকজনকে জরিমানা করা হলেও একবারে এই বিষয়টি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বাজারে কোম্পানিগুলোর সর্বনিন্ম ১০ শতাংশ বা সর্বনিম্ন ৩০ কোটি টাকা পেইড আপ করা যায়নি। সেটা করা সম্ভব হলে কারসাজির পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেত। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানিগুলো শেয়ার দরে প্রতিনিয়ত নজর রাখা এবং বাজারে স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানি শেয়ার বাড়িয়ে চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক রেখে বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করা।

এ বিষয়ে এনসিসিবি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মনজুরুল আলম বলেন, স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানির শেয়ারগুলো কখনোই বাজারের জন্য ভালো নয়। আমরা গ্যাম্বলিং বলব না, তবে যারা বাজারে কারসাজি করতে চায়; তারা এই শেয়ারগুলো নিয়ে সহজেই সেটা করতে পারে। ফলে শেয়ারগুলো দাম বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হয় এবং সব শেয়ার বেশি দামে বিক্রি করে তারা বের হয়ে যাওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা শেয়ারগুলো নিয়ে বিপদে পড়ে। ফলে শেয়ারগুলো নিয়ে বছরের পর বছর বসে থাকে। কোনো লভ্যাংশও পায় না, সেই দামে বিক্রিও করতে পারে না এবং তাদের পুঁজি সেখানে আটকে থাকে। আর দিন শেষে লাভবান হয় কারসাজিকারীরাই। তাই এই স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ার যাতে প্রতিনিয়ত লেনদেন হয়। অন্য কোম্পানিগুলোর মতো শেয়ারের চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক থাকলে এই কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, স্বল্প পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানির আরও শেয়ার ছেড়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়িয়ে কারসাজি বন্ধ করতে হবে। যাদের বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা ভালো নয় এবং পরিশোধিত মূলধনও অনেক কম, তারা কিন্তু শেয়ার ছেড়ে মূলধন বাড়িয়ে ব্যবসায় ভালো করতে পারে। এতে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনও বৃদ্ধি পায় এবং বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যদি কোনো কোম্পানি তালিকাচ্যুত হতে চায় তবে যেসব স্বল্প পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির শেয়ার দর বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তালিকাচ্যুত হতে চাইলে কোম্পানির শেয়ার দরের এক থেকে দুই বছরের গড় দাম বিনিয়োগকারীদের দেয়া উচিত বলে তিনি জানেন। এতে বিনিয়োগকারীরা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আর বিএসইসির উচিত স্বল্প পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাড়ানো এবং যেগুলো তালিকাভুক্ত হবে সেগুলোর কম পরিশোধিত মূলধন নিয়ে তালিকাভুক্ত না করা। সেই সঙ্গে এই শেয়ারগুলো নজরে রাখা এবং যারা কারসাজি করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা। শেয়ার বিজ